কথ্য কার্টুন : ঘরে থাকুন
মোহাম্মদ মুশফিকুর রহমান,
আমাদের এই পৃথিবীর একটি দিবস আছে। দিবসটি আগামী ২২ ই এপ্রিল। নাম বিশ্ব ধরিত্রী দিবস বা পৃথিবী দিবস। পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার করার লক্ষে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে থেকে আজ অবদি ১৯৩ টি দেশ এই পৃথিবী দিবসটি পালন করে। দক্ষিন এশিয়ার সদস্য দেশ হিসাবে ভুটানও এই দিবসটি পালন করে। ভূটানের কথা এখানে বলার একটি কারন আছে। এবারের ২২ ই এপ্রিলের এই সময়টা বর্ষা ও বজ্রপাতের সময় দিয়েই যাচ্ছে আর ভুটানকেই বজ্রপাতের দেশ বলা হয়। পৃথিবীতে সবচাইতে বেশী বজ্রপাত হয় ভূটানেই। কিন্তু বজ্রপাতের দেশ ভূটান হওয়া সত্বেও বজ্রপাতে তাঁদের মৃত্যুর হার আমাদের দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হারের চায়েও অনেক অনেক কম। ভারতের পাশে আমাদের বাস, ভূটানও ভারতের পাশে। সে দিক থেকে ভূটান আমাদের কাছের দেশ। বজ্রপাত বাংলাদেশে একধরনের মহামারীতে পরিনত হয়েছে। কারন অতীতের তুলনায় বর্তমানে বজ্রপাতে বহুলোক প্রান হারায়। বজ্রপাতের সময় বাঁচার একমাত্র উপায় হল ঘর থেকে বাহির না হওয়া। মাথায় ছাতা দেন আর যা কিছুই দেন বজ্রপাতের সময় বের হলে বজ্রাঘাত মাথায় আসতেই পারে। বজ্রপাতকে বর্ষার সময় আকাশের দানবও বলা হয়। দানবের সাথে মনবের পেড়ে উঠা এত সহজ নয়। গ্রামে বজ্রাঘাত বেশী হয় কারন শুপাড়ি গাছ, নারকেল গাছ ,তালগাছ সব কেটে সাফ। তাই দানব আকাশ থেকে নেমে গাছে বসার জায়গা না পেয়ে মাথায় এসে পড়ে। এই অসতর্ক মানবগুলোকে বাঁচানোর জন্য আমাদের দেশের ত্রান ও দূর্যোগ মন্ত্রনালয় ইতিমধ্যে ১০ লক্ষ তাল গাছও লাগিয়েছে । কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমে নাই। ঢাকা সহ দেশের আটটি স্থানে বজ্রপাতের রিডিং নেওয়ার ডিটেক্টর মেশিন বসিয়েছে। এতে আকাশ দানবের সাইজ মাপা যাবে কিন্তু অসতর্ক মানুষগুলোর মৃত্যু আর থামানো কি যায় ? দানবের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল ঘরে থাকা। বজ্রপাতের সময় বিড়ি সিগারেট টানার জন্য বাহির হলেও বজ্রদানব মাথায় এসে পড়তে পারে কারন এই দানব বিড়ির আগুনকে ভয় পায় না। এই সময় ভূটানের নাগরিকরা বিড়ি টানতেও বের হয় না,তারা সতর্ক। ওদের মাথায় বজ্রাঘাত পড়ার চান্স নাই । আবার ভূটানই বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা সর্বপ্রথম তাদের দেশকে প্রকাশ্যে ধুমপান থেকে মুক্ত করতে পেড়েছে। কারন তারা বুঝে ফেলেছে বিড়ি খেলে ফুসসুস দূর্বল হয়ে যায়,ফুসসুসের বারোটা বাজে। বিড়ি না খেলে ফুসফুসে ভাইরাস ধরে কম আর ফুসফুস একেবারেই সুস্থা থাকে।
এবার ভূটানের এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনা একটি গল্প বলি। বহু বছর পূর্বে ভূটানে এক কবিরাজ ছিলেন । সেই কবিরাজ সারাদিন মানুষের রোগ নিরাময়ের জন্য ঔষধ দিতেন আর রাত জেগে উচু পাহাড়ে গিয়ে ধ্যন করতেন। তখন ভূটানে কোন সাধনা বা ধর্ম বলে কিছুই ছিল না। তখন মানুষ নিজ কর্ম করতেন, ফসল ফলাতেন আর যা পেত তা দিয়েই কোন রকম দিন পার করত। কবিরাজ সেই ধ্যন থেকে মন্ত্র নিতেন। প্রকৃতি থেকে উপাদান সংগ্রহ করতেন আর নতুন নতুন রোগের ঔষধ বানাতেন। আশপাশের পাথরে রোগের নাম অনুযায়ী ঔষধের নাম লিখে রাখতেন। অসুস্থ মানুষ খাদ্যদ্রব্য নিয়ে কবিরাজের কাছে আসতেন, খাদ্য সামগ্রী কবিরাজকে দিতেন আর ঔষধ নিয়ে যেতেন। যেটা ছিল বিনিময় প্রথা। হঠাৎ করে উচ্চ শ্রেণীর এক দুষ্ট ধাচের মানুষ কবিরাজকে তার সেবা অতি সহজলভ্য করতে বারণ করলেন। এবং বলে দিলেন যে, যারা সেবা নিবেন তাদেরকে সেবা নিতে হলে সমাজপতিদের কাছ থেকে ক্ষুদ্র চিরকূট নিয়ে আসতে হবে। এই চিরকুট নিতে গিয়ে যারা সমাজপতিদের কাছে যেতেন তাদের হাত থেকে খারাপ মানুষগুলো সকল খাদ্যদ্রব্য রেখে দিতেন। কবিরাজ ভয় পাওয়া সত্ত্বেও ঔষধ সেবা দিয়ে যেতে লাগলেন । ধীরে ধীরে খারাপ মানুষটির আরো বেশী লোভ চলে এল। সে ফন্দি করল যে, কবিরাজ কে আর ঔষধ বিলি করতে দিবে না। সে সমাজপতিদের সাথে হাত মিলিয়ে কবিরাজকে তাড়িয়ে দেয় এবং নিজেই কবিরাজ সেজে গেল। আর কবিরাজ কোন পাহাড়ে গিয়ে ধ্যন করে সেই স্থানও লুকিয়ে দেখে নিল।এভাবে খারাপ মানুষটি কবিরাজ হয়ে গেল। ওন্যদিকে অসহায় বৃদ্ধ কবিরাজ ব্যথিত মন নিয়ে চলে গেলেন অপর এক গহীন পাহাড়ে। ভন্ড কবিরাজের ধ্যন ও মন্ত্র যখন একীভূত হচ্ছিল না,তখন আর বৃদ্ধ কবিরাজ থেকে কেড়ে নেওয়া ঔষধেও কাজ করছিল না। নিরীহ রোগাক্রান্ত মানুষগুলো আরো বেশী রোগা হতে লাগল। এভাবে চলতে চলতে রোগ মহামারী রুপ ধারন করল। অভুক্ত বৃদ্ধ কবিরাজ তখন সহজ সরল গ্রামবাসীর মহামারী থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করলেন। অভুক্ত বৃদ্ধ কবিরাজের আর্তনাদ তখন সৃষ্টিকর্তা মঞ্জুর করলেন আর তখনই প্রচুর বজ্রপাত শুরু হল। বজ্রাঘাতে দুষ্ট লোক মিথ্যা ধ্যনরত অবস্থায় পাহাড়েই মারা গেলেন। আর বজ্রাঘাতের আলোতে সকল কিছুই কবিরাজ দেখতে পেলেন। কবিরাজ আবার তার নিজ গ্রামে ফিরে এলেন এবং গ্রামবাসীকে বললেন ” এই যে প্রচুর বজ্রাঘাত চলছে এটিও একটি মহামারী, মহামারীতে ঘর থেকে বের হতে নেই। মহামারী চলে যাবে। তোমরা যদি বের হও তাহলে নির্ঘাত মারা যাবে,তখন আমার দোষ দিতে এসো না”।
ভূটানের এই প্রচলিত গল্প শুনার পর মনে পড়ে গেল সেই মার্কিন কবি এডগার এলান পোর একটি কবিতাংশঃ
” বজ্রপাতে চিত্তবিক্ষোভের অশনি সংকেত,
আমার কোন সময় নেই নিষ্কর্মা ভাবনাহীন থাকার,
উত্তাল আকাশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে,
এক ঘন্টা পর উড়তে শুরু করা,
নিক্ষিপ্ত আত্মা এসে পড়ে আমায়,
কিছুটা সময় বাদ্যবীনা ও শায়েরে’র ছন্দে,
সময় কাটাই ছুটির আমেজে “।
এবার আসি আমাদের কথায়, বর্তামান সময়ে বজ্রপাত ও করোনা ভাইরাস এমন একটি সমস্যা যার করনে ঘর থেকে বের হলেই আছে মৃত্যুর ঝুঁকি। করোনা ভাইরাসের আক্রমনে গোটা বিশ্ব পর্যদুস্ত। আমাদের ঘরে থাকতে হবে। বাহিরে থাকলে দ্রুত ঘরে ঢুকে যেতে হবে। ছাতা যেমন বজ্রাঘাত থেকে বাঁচাতে পারবেনা, নাম মাত্র মাস্কও করোনা থেকে বাঁচাতে পারবে না। এক মাত্র ঘরে থাকলেই বাঁচা যাবে।ধৈর্য ধরতে হবে। আর বসে থাকা দিন গুলোর ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও করতে হবে।
সূফী দার্শনিক জালালউদ্দিন রুমীর একটি বিশ্বখ্যাত উক্তি আছে। তা হল “ ধৈর্য মানে শুধু বসে বসে অপেক্ষা করা নয়, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকিয়েও গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দিনের আলোকে দেখা। “
লেখকঃ মোহাম্মদ মুশফিকুর রহমান।



