পটিয়ায় ছাত্র-জনতার উপর সশস্ত্র হামলা
নিভে গেল হাফেজ মোর্শেদের চোখের প্রদীপ
-হাসপাতালে নেওয়ার পথে হয়েছিলেন হামলার শিকার।
-চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
-এখনো পায়নি সরকারি সহযোগিতা।
‘জুলাই বিপ্লব’-এ চোখের আলো হারিয়ে ফেলা বিপ্লবীদের নিয়ে কবি আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, “চোখে গুলি লেগে অন্ধ হয়ে গেছে যে যুবক, তাকে আমি কী করে দেখাই-আজ রাতে খুব করে জোছনা হবে।” মোরশেদুল হক জোছনার আলো শেষ কবে দেখেছিলেন ঠিক জানা নেই-জানতে চাওয়াটাও বোধহয় ঠিক হবে না। যদি ভরা জোছনার মাতাল করা রাতের কথা ভেবে কষ্ট পায় ! তবে পৃথিবীর সর্বশেষ আলো দেখেছিলেন ‘২৪ সালের ৪ আগস্ট দুপুরের আগ পর্যন্ত।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের ‘এক দফা’ দাবিতে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ডাক বাংলোর মোড় থেকে শুরু হয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার মিছিল। মিছিলটি প্রথমে হামলার শিকার হন পটিয়া সদরের মুন্সেফ বাজার এলাকায়। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আক্রমণে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা রক্তাক্ত হন। তবুও তারা থেমে থাকেনি, মিছিল নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। আনুমানিক দুপুর ১২.৩০ টার দিকে মিছিল মুন্সেফ বাজার অতিক্রম করলে আরেক দফা সশস্ত্র হামলার মুখোমুখি হন পটিয়া উপজেলা গেইটের আগে। আওয়ামিলীগ সন্ত্রাসীরা ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি করতে থাকে। সন্ত্রাসীদের ছোড়া ৩টি গুলি সরাসরি মোরশেদের চোখে লাগে। এরপর থেকে আর কিছুই দেখতে পাননি মোরশেদ।
আহত মোরশেদকে তার সহযোদ্ধারা উদ্ধার করে এম্বুলেন্সে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম শহরের দিকে যাত্রা করে। মোরশেদকে বহনকারী এম্বুলেন্সটি পটিয়া উপজেলার শান্তিরহাট এলাকায় পৌঁছালে সেখানে তারা আরেক দফা হামলার শিকার হন। তাদের মারধর করে এম্বুলেন্সের গ্লাস ভেঙ্গে দেয়। এতে এম্বুলেন্সের চালকসহ ৫ জন আহত হন। গাড়ি থেকে নামিয়ে যাদের মারধর করা হয় তাদের একজন পটিয়া মাদ্রাসার ছাত্র আব্দুল মাবুদ। আব্দুল মাবুদ বলেন, “পটিয়া জেনারেল হাসপাতালের এম্বুলেন্সে আমরা গুলিবিদ্ধ মোরশেদ ও মিনারকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের গাড়ি শান্তিরহাট পৌঁছালে পূর্ব থেকে অবস্থানকারী সন্ত্রাসীরা আমাদের গাড়িতে আক্রমণ করে এবং আমাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর করে। গাড়ির ড্রাইভারকেও মারধর করা হয়। ”
মোরশেদকে প্রাথমিকভাবে চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) ভর্তি করানো হলেও সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শঙ্কায় তাকে সেখান থেকে চট্রগ্রামের ন্যাশনাল হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে গেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ লেজার সার্জারী করার পরামর্শ দেন। সেখানে মোরশেদের লেজার সার্জারী হয়। সার্জারীর প্রায় ৩ মাস পর গতকাল (মঙ্গলবার) সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তার চোখের চেকআপ ছিলো-যেটার সম্পূর্ণ খরচ তার পরিবারকে বহন করতে হয়। মোরশেদুল হক বলেন, ” সহযোগিতা দূরে থাক-সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কেউ যোগাযোগও করে নি। কোনো কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে নয় বরং ইসলাম ও এই দেশের মাটিকে রক্ষার জন্য সেদিন রাজপথে ছুটে গিয়েছিলাম।”
মোরশেদুল হক আল-জামেয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া মাদ্রাসার ইসলামিক স্টাডিজ, শর্ট কোর্স-২য় বর্ষের ছাত্র। ৪ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের ৩য় সন্তান। মোরশেদ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের হাফেজ জাফর আলমের পুত্র। হাফেজ জাফর আলম একটি মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি ও পটিয়া মাদ্রাসার ছাত্র কাসেম আল নাহিয়ান বলেন, ” অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আহতদের উন্নত চিকিৎসা প্রদান ও শহীদ পরিবারকে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। মোরশেদরা দেশের জন্য জীবন দিতে রাজপথে নেমে এসেছিলো। তাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবহেলা খুবই দুঃখজনক।”



