ফারহান উদ্দীন সোহাগ,
কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সুদীর্ঘ ৫০ বছর পর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় একটি গণকবর চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই গণকবরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান এর) দেশীয় দোসরদের হাতে গণহত্যার শিকার ছয়জনকে সমাহিত করা হয়েছিল এবং তাঁরা প্রত্যেকে হিন্দুধর্মাবলম্বী ও জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন।
মরিয়ম আশ্রমের (মা মারিয়া) তৎকালীন ধর্মযাজক ব্রাদার ফ্লিভিয়ান গণহত্যার স্থান থেকে লাশগুলো এনে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সমাধিস্থলের এক পাশে সমাহিত করেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর এত বছর ধরে এই হত্যাকাণ্ড ও গণকবরের বিষয়ে এলাকাবাসী জানলেও এত দিন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা যায়নি।
গত ১৭’ই জানুয়ারি রোজ-রোববার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে গণকবরটি পরিদর্শন করে চিহ্নিত করেন কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিনা সুলতানা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুকান্ত সাহা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সাহাদুল হক।
উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে জানা যায়, ১৯৭১ সালের মে মাসে বড় উঠান এলাকার শাহমীর মাজারের পশ্চিমে আসকর মিয়াজি মসজিদের পাশে ফিরিঙ্গি পাড়াসংলগ্ন এলাকায় ছয়জন হিন্দু ও তিনজন মুসলমানকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে পাকিস্তানি বাহিনী। ওই হত্যাকাণ্ডের পর সেখানে গিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এম এন ইসলাম, নুর হোসেন, সাহাদুল হক ও প্রয়াত আমির আহমদ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী জানতে পারা যায়- হত্যাকাণ্ডের দিন জুলধা এলাকার মুসলিম পরিবারের তিনজনকে নিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন। তবে ভয়ে লাশ নিতে পারেননি হিন্দু সম্প্রদায়ের ছয়জনের স্বজনেরা। ওই দিনই বিকেলে মরিয়ম আশ্রমের তৎকালীন ব্রাদার ফ্লিভিয়ান লাশগুলো উদ্ধার করে খ্রিষ্টানদের সমাধির পাশে সমাহিত করেন। গণকবরটি ঘটনাস্থ হতে আনুমানিক ৫০০ ফুট দূরত্বে অবস্থিত।
কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নে দেয়াং পাহাড় এলাকার খ্রিষ্টানপল্লির মরিয়ম আশ্রমের সমাধির পাশেই সবুজ গাছগাছালি ঘেরা নিরিবিলি স্থানে সমাহিত করা হয়েছে ছয় শহীদকে।
জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সাহাদুল হক এর এক সাক্ষাৎকার হতে জানা যায়- মে মাসের কোনো এক দিন হত্যাকান্ডটি হয়েছে, তবে কোন দিন ছিল তা তার সুস্পষ্ট মনে নেই। তবে ঘটনার পরের সবই মনে আছে তাঁর। ঘটনার দিন দুপুরে মেরিন একাডেমি ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি বাহিনী এসে এ হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে তাদের সহযোগী ছিল স্থানীয় দেশীয় দোসর এরা।
‘২০১৪ সালে গণকবরটি চিহ্নিত করে সংরক্ষণের জন্য আবেদন করেছিলেন তারা। তখন একবার পরিদর্শনও হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতায় বেশি দূর এগোনো হয় নি। দীর্ঘদিন পর হলেও গণকবরটি চিহ্নিত হওয়ায় তারা আনন্দিত।’ একাত্তরের মে মাসের গণহত্যার পরপরই হত্যাকাণ্ডের স্থানটি ঘুরে আসেন সেই মুক্তিযোদ্ধা।
কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসন সূত্রে আরো জানা যায়, ছয় শহীদকে সমাহিত করা ব্রাদার ফ্লিভিয়ান ছিলেন মরিয়ম আশ্রমের (মা মারিয়া) প্রতিষ্ঠাতা। বিদেশি এই নাগরিক মারা যান ২০০৪ সালে। তবে গণকবরে শুয়ে থাকা ছয় শহীদের স্বজনদের পরিচয় জানতে পারেনি প্রশাসন।
কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরী মুঠোফোনে বলেন,
আমরা স্বাধীনতার সুদীর্ঘ এত বছর পর এই স্থানটা চিহ্নিত করতে পেরেছি সে জন্য আমরা সত্যি আনন্দিত এবং কৃতজ্ঞ তাদের প্রতি যাদের কারনে এই স্থানটি চিহ্নিত করা সম্ভপ হয়েছে।
প্রথমে আমি এই বিষয়ে সোর্স পেয়েছিল ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রসাশনিক কর্মকর্তা গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব জুলধা ইউনিয়নের কৃতি সন্তান এ বি এম আমিন উল্লাহ্ নূরী হতে। এবং তথ্য সংগ্রহ করে সার্বিক সহযোগীতা করছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্ণফুলী উপজেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক ইউ পি সদস্য ওসমান গনি।
স্থানটি সংরক্ষণের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান- এসব স্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এর সাথে এসকল স্থানের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে নিভিড় ভাবে। তাই আমরা এই গণকবরের স্থান সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।