মুহাম্মদ দিদার হোসাইন,
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্টে শ্রমিকের বুকে গুলি চালানোর এ্যাকশানে এরা কারা? পুলিশ নাকি শ্রমিক? পুলিশ হলে মাথায় শ্রমিকের হেলমেট কেন? এমন প্রশ্নে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ। পুলিশের গুলিতে আহত আরো ২ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।এই পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭ জনে দাঁড়ালো।
গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার বিকেল ৫ টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীনে মৌলভী বাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আব্দুল মালেকের পুত্র মোহাম্মদ শিমুল (২৩) ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বেতদীঘি গ্রামের আব্দুল মান্নানের পুত্র মুহাম্মদ রাজেউল ইসলাম (২৫) চট্টগ্রাম পাঁচলাইশ থানার পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত হয়।
এব্যাপারে বাঁশখালী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শফিউল কবির বলেন, গণ্ডামারার ঘটনায় আহত দুই শ্রমিক মৃত্যুর
খবরটি নিশ্চিত করেছেন বলে জানা, এসময় তিনি বলেন, শিমুল (২৩) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীনে এবং রাজেউল ইসলাম (২৫) নামের এক জন পাঁচলাইশ থানার পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন বলে জানান ওসি শফিউল কবির।
২১ এপ্রিল (বুধবার) বিকেলে সরেজমিনে তদন্ত কালে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মুখে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি প্রতিবেদক।
১৭ এপ্রিল (শনিবার) সকালে এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্টে শ্রমিকের বুকে গুলি চালানোর এ্যাকশানে মাথায় শ্রমিকের হেলমেট ও পুলিশি ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় স্বসস্ত্র বাহিনীর কিছু লোকের ছবি মানুষের হাতে দেখা যায়। অনুসন্ধানকালে স্থানীয় লোকজন প্রতিবেদকের কাছে জোর গলায় বলতে থাকে সাংবাদিক ভাই এই ছবিতে দেখেন ওরা কারা? যারা মাথায় শ্রমিকের হেলমেট কিন্তু পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় স্বসস্ত্র নিয়ে নিরীহ শ্রমিকের বুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পাখির মতো শ্রমিক হত্যায় মেতে উঠেছিল।
কিন্তু কেন? কি অপরাধ ছিলো নিরীহ শ্রমিকদের?পেটের জ্বালায় চাকরি করে সঠিক সময়ে বেতন ভাতা দাবি?পবিত্র রমজান মাসে তারাবীহ নামায ও ইফতারের জন্যে কর্মসময় ১০ ঘন্টা থেকে ২ ঘন্টা কমিয়ে ৮ ঘন্টা করার দাবি?আবাসনের জন্যে পরিবেশ বান্ধব স্থানের দাবি?শ্রমিকদের দাবি গুলো কি আসলে যুক্তি সাংঘর্ষিক?
উল্লেখিত দাবি গুলো শ্রমিকদের নৈতিক অধিকারের আওতায় পড়ে কিনা তা জানার অপেক্ষায় সাধারণ জনগণ।
শনিবার যমুনা টিভির প্রতিবেদকে এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্টের সমন্বয়ক ফারুক আহমেদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্টে চলমান কিছু অংশ কাজের দায়িত্ব না পাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে একটি মহল শ্রমিকদের উস্কানি দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। ফারুক আহমেদ এর বক্তব্য যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে সুবিধা বঞ্চিত তারা কারা?
শনিবার সংঘটিত হতাহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রজেক্টের মালামাল লুটসহ শ্রমিকদের উস্কানির অভিযোগে ২২ জনের নাম উল্লেখে অজ্ঞাত নামাসহ প্রায় হাজারের বেশি আসামি করে দায়ের করা মামলায় উস্কানি দাতাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে কিনা? তা নিয়েও অনেক প্রশ্ন স্থানীয় জনসাধারণের।
উস্কানি দাতারা যদি মামলার আসামি না হয়ে থাকে তাহলে জনগণ জানতে চায় এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্টের সমন্বয়ক ফারুক আহমেদ এর সাথে উস্কানি দাতাদের ঘণিষ্ঠতার বহিঃপ্রকাশ কিনা?
এই ঘটনার জন্যে দায়ী কে? ফারুক আহমেদ নাকি উস্কানি দাতা তার ঘণিষ্ঠজনরা?
পুলিশের গুলিতে নিহত ৫ শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোন হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে কিনা তাও জানতে চায় সচেতন নাগরিক সমাজ। নিহতের ঘটনা কি হত্যা নাকি অপমৃত্যু এটা জানতে চায় তারা। ঘটনার দিন স্থানীয়রা নিরব ভূমিকা পালন করা সত্তেও দুই মামলার আসামি স্থানীয় নিরীহ জনগণ কেন?
শ্রমিকদের বুকে গুলি চালানোর জন্যে পুলিশ মোতায়েন থাকাবস্থায় লুটপাট করতে বহিরাগত লোকজন প্রজেক্ট এরিয়ায় প্রবেশ করার দৃশ্যটা ফারুক আহমেদ এর যোগসাজশে হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার দাবিও জানান স্থানীয়রা।
বিগত ২০১৬ সালের ৪ঠা এপ্রিল ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে-বিপক্ষে নিয়ে স্থানীয়দের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের গুলিতে ৪ জন নিহতের ঘটনায় পৃথক পৃথক মামলার আসামি হয়ে মাসের পর মাস গৃহ ছাড়া হয়েছিল এলাকার হাজার হাজার নিরীহ মানুষ।কারাবরণও করতে হয়েছিল অনেককে। নির্বিচারে গুলি করে এসব আলম এর হয়ে মানুষ হত্যা করবে পুলিশ আর খেসারত দিবে জনগণ এটা কোন ধরনের কৌশল?
শনিবার সংঘটিত শ্রমিক হত্যার পর কতৃপক্ষ ও পুলিশের দায়ের করা দুই মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষকে আসামি করে মামলা দায়েরের খবর ছড়িয়ে পড়ায় গ্রেফতার আতঙ্ক চলছে পুরো এলাকা জুড়ে।
নিহত হাফেজ মাহমুদ রেজার পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করা হলে নিহত রেজার মাতা নুরাঈন জান্নাত কান্না কণ্ঠে বলেন, আমার পরিবারের অভাব অনটনের দরুণ আমার ছেলেকে এস আলম প্রজেক্টে চাকরিতে পাঠিয়েলাম, কিন্তু ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে আমার আদরের ছেলের জন্যে মর্গে পরিণত হবে তা কখনো কল্পনাও করিনি। তাঁর ছেলের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কোন মামলা করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এস আলম কোম্পানি আমার ছেলের বিনিময়ে ৩ লাখ টাকা আমাদেরকে দিয়েছে।তারা নাকি সরকারের লোক,আর পুলিশের বিরুদ্ধে কোন মামলা করলে আমাদেরকেও মরতে হবে তাই মামলা করিনি। ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর হওয়া মায়ের মূখের এমন কথা সত্যিই বিস্ময়কর! অপরদিকে নিহত মাহমুদ রেজার বড় ভাই নুর মোহাম্মদ ওমান প্রবাসী তাঁর ফেইসবুক আইডিতে লাইভে এসে তাঁর ছোট ভাইয়ের হত্যার বিচার দাবি করেন। এসময় নুর মোহাম্মদ তাঁর ছোট ভাইয়ের হত্যার বিচারের দাবীতে দেওয়া ভিডিও লাইভটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে সকল ফেইসবুক বন্ধুদের প্রতি অনুরোধ জানান।
শনিবার পুলিশের গুলিতে নিহতদের জনপ্রতি ৩ লাখ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে প্রাথমিক ভাবে ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসা খরচ বাবদ প্রদানের জন্যে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের দাবি নিহতের জনপ্রতি ৩ কোটি টাকা এবং আহতদের জনপ্রতি ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছে দিতে জোর দাবি তুলেন এবং পুলিশের ইউনিফর্ম পরিহিত মাথায় পায়ে শ্রমিকের হেলমেট মাথায় এবং পায়ে শ্রমিকের জুতা পড়ে স্বস্বস্ত্র হাতে নিয়ে শ্রমিকদের বুকে গুলি চালানোর এ্যাকশানে এরা কারা? এবং ফারুক আহমেদের বক্তব্য মতে উস্কানিদাতা কারা তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান স্থানীয়রা। সেই সাথে নিরীহ কোন মানুষকে পুলিশি হয়রানি না করার দাবিও জানান স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন
লোক বলেন, বিদ্যুৎ প্রকল্পের সমন্বয়ক ফারুক আহমেদ দায়িত্বে আসার পর থেকে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীদের হাতে নিয়ে নিরীহ মানুষের ভুমি জবর দখলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে,,এর মধ্যে গণ্ডামারা ব্রীজ থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্প সংযোগ নির্মাণ কাজের নামে স্থানীয়দের বসতঘর ও ফসলী জমি জবর দখল করে নিয়েছে,, এতে জমি মালিকরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে জসিম উদ্দিন সিকদার, জমির উদ্দিন সহ আরো বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষকে বিনা অপরাধে জেলও খাটতে হয়েছে।রাতে অন্ধকারে স্থানীয় ওই প্রভাবশালীদের নিয়ে নুরুল আজিম, রূহুল আমিন, তারেক সিকদার, ইলিয়াস সিকদার, জাহাঙ্গীর আলম, মাহমুদুল হক, কামাল উদ্দিন ফকিরদের ভাঙচুর করতেও দ্বিধা করেনি ফারুক।কিন্তু যাদের দিয়ে ফারুক আহমেদ এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছে বিগত কয়েক মাস ধরে ফারুক আহমেদ ও তাদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে শুধু তা নয়, তাদের মধ্যে ছোট খাটো কয়েকটি ঘটনাও ঘটেছে। মাস দুই এক পূর্বে ওই প্রভাবশালীদের কয়েক জনের সাথে ধস্তাধস্তি হয়েছিল,এতে এক পর্যায়ে ফারুক আহমেদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ঐ প্রভাবশালীরা তার পরনে কাপড় ছেড়া সহ ফারুকের মাথায় ও শরীরে হালকা আঘাতও হয়েছিল, কিন্তু তার ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় প্রকাশ্যে কোন প্রতিবাদ না করেই নীবরে সহ্য করেছিল সব আঘাত।
তবে ভিতরে ভিতরে পরষ্পরের মধ্যে হিংসার আগুন দিনদিন বৃদ্ধি পাওয়াতে ফারুক আহমেদ ও তার ঘনিষ্ঠ জনদের বিরোধই শনিবার সংঘটিত সংঘর্ষের কারণ হতে পারে বলে এমন তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে আসে।
তাছাড়া প্রজেক্ট এরিয়ার ভিতরে এবং বাইরে যেই সব ক্যান্টিন রয়েছে সব ক্যান্টিন ফারুক আহমেদ ও তার ঘনিষ্ঠ স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রেখে পরষ্পর লক্ষ লক্ষ টাকা ইনকাম করছেন বলেও তথ্য জানা। হঠাৎ তাদের মধ্যে দূরত্বের কারণকে শ্রমিক হত্যার মূল কারণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
সংঘর্ষের দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে ৫ শ্রমিক নিহত হওয়ার পর বুধবার শিমুল (২৩) এবং রাজেউল ইসলাম (২৫) নামের আরো ২ জনের মৃত্যুর ঘটনা ছড়িয়ে পড়ায় একদিকে থমথমে বিরাজ করছে অন্যদিকে গ্রেফতার আতঙ্কে গণ্ডামারা-বড়ঘোনা জুড়ে পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে।