নাঈম আহমেদ কপিল,
সারা বিশ্বের মত আমাদের দেশেও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারী উদ্যোগ সর্বমহলে সমাদৃত। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে এখন অসংখ্য মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর প্রথম পছন্দ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা প্রদান সারাদেশে একটা বিপ্লব সাধন করেছে। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) এই বিপ্লবের প্রথম সারির অংশীদার। সামাজিক কল্যাণ ও উন্নয়নে আগ্রহী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের স্বনামধন্য জ্ঞানী-গুণী কিছু ব্যক্তির উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশাত্নবোধ, মানবতাবোধ, সততা, বিজ্ঞানমনস্কতা, দক্ষতা এবং জীবনধর্মীতা সৃষ্টি করা, যাতে ধর্ম ও বিজ্ঞানের আলোকে তারা আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি অনুষদের অধীনে ১১টি বিভাগ রয়েছে। বিভাগগুলোার নাম হলো কোরআনিক সায়েন্স এন্ড ইসলামিক স্টাডীজ,দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডীজ, হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডীজ, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক এন্ড টেলিকম্যুনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসী, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, অর্থনীতি ও ব্যাংকিং, ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য ও আইন বিভাগ। ৮টি সেমিস্টারে এসব বিভাগে পাঠদান করা হয়। মে-জুন এবং অক্টোবর-নভেম্বরে ভর্তি ফরম ছাড়া হয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০১ জন সার্বক্ষণিক শিক্ষকসহ প্রায় ৪০১ জন শিক্ষক এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রদান করছেন। সমৃদ্ধ অবকাঠামো আইআইইউসি’র একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ৪৩ একর জমির উপর নিজস্ব ক্যাম্পাসে প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষের অধিক বর্গফুট জায়গায় ৪০টি ভবনে আইআইইউসি’র শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যেদিকে দৃষ্টি যাবে সবুজ আর সবুজ। এভাবেই আইআইইউসি’র নিজস্ব ক্যাম্পাস সাজিয়েছেন বোর্ড অব ট্রাস্টীজের সদস্যগণ এবং বিউটিফিকেশন কমিটি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই যে, ২০১৫ ও ২০১২ সালে সারাদেশে বৃক্ষরোপণে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাটাগরীতে আইআইইউসি প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।
পর্যাপ্ত পরিমাণ অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টারনেট ল্যাব, ইন্টারনেট সুবিধা, ৩৫ হাজার টাইটেলের ৮৪ হাজার ৪৩৪টি বইয়ের লাইব্রেরী নিয়ে সমৃদ্ধ এই বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমান ছাত্রসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ৭৮৬।
উচ্চ শিক্ষায় ইচ্ছুক দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিষয়গুলো দেখার জন্য স্টাফ ডেভেলপমেন্ট ও স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ডিভিশন নামে আলাদা একটি ডিভিশন রয়েছে। প্রতিবছর দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদেরকে প্রায় ৩ কোটি আর্থিক সুবিধা এবং বৃত্তি প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য যে ইতোমধ্যে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে বিনা ফী-তে অধ্যয়নের সুযোগ দিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়।
উচ্চশিক্ষায় গবেষণাকে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। গবেষণা কাজকে বিশেষভাবে প্রমোট করার
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) ওয়েবমেট্রিক র্যাংকিং এ বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় গুলির মধ্যে ২৫ তম স্থান অর্জন করেছে। এবং ইউজিসির তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে টপ ৯ম তম স্থানে ও চট্টগ্রামে ১ম স্থানে অবস্থান করছে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের আলোকে আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের পছন্দের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইআইইউসি। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম ট্রাস্ট (আইইউসি) এর তত্ত্বাবধানে থাকা ১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের আওতায় অনুমোদন লাভ করে, এবং সেই বছর থেকেই এর কার্যক্রম আরম্ভ হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা সহ মোট ৩ টি ক্যাম্পাস ছিলো, পরে বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরী কমিশনের নির্দেশনায় ২০১৬ সালে সকল ক্যাম্পাস গুটিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে সীতাকুন্ড উপজেলার কুমিরাতে স্থায়ী ক্যাম্পাসে অন্যান্য ক্যাম্পাসের কার্যক্রম শুরু করে।অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাহাড় ও সাগর এর বুক থাকা সীতাকুন্ড উপজেলাটি। ঐ উপজেলার সৌনাইছড়ি ইউনিয়নের মধ্যম ঘোড়ামরা এলাকার তিনটি আবাসিক হল, তিনটি একাডেমিক ভবন, পাঁচটি অনুষদ ভবন, একটি লাইব্রেরী ভবন, সেন্ট্রাল মসজিদ ও অডিটরিয়াম/লেকচার থিয়েটার নিয়ে চলছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত কার্যক্রম। এখানে লেখাপড়া করছেন ১১ হাজার ৭৮৬ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, চীন, সোমালিয়া, মালদ্বীপ, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া ও সুদানের দুই শতাধিক শিক্ষার্থীও রয়েছেন। এখানে লেখাপড়া করছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অমুসলিম ছাত্রছাত্রী ও।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ লাইব্রেরি আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কুমিরা ক্যাম্পাসে অবস্থিত লাইব্রেরিটি। যেখানে প্রায় ৮০ হাজার ও বেশি বিভিন্ন বই রয়েছে, এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা কর্ণার, একুশে কর্নার, বঙ্গবন্ধু কর্ণার রয়েছে। যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের বিভিন্ন বই থেকে শিক্ষার্থীরা নতুন করে মহান এই নেতাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২৫ বছরের ইতিহাসের মধ্যে এই বছরটি ছিলো স্বরণীয়। অনেকে অনাকাক্ষিত ঘঠনার সাক্ষী হয়ে থাকবে ২০২০ সালটি। বছরের শুরুতে ছাত্রলীগের রাজনীতি অনেক কিছুর জন্ম দিয়েছে। শিক্ষক লাঞ্ছিত, ছাত্র নির্যাতনের সহ নানা অভিযোগের তীর ছিলো ছাত্রলীগের দিকে। কিন্তু ছাত্রলীগ এই সব অভিযোগের দায় নিতে রাজি নয়। উল্টো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দৌইত আচরণ এর অভিযোগ করছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ।
গত ২৭ জানু্য়ারী আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় চট্রগ্রাম এর কুমিরা ক্যাম্পাসে এক শিবির কর্মীকে ছাত্র্লীগ কতৃক নির্যাতেন অভিযোগ ওঠে।এই ঘঠরনার জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ১০ ছাত্রকে বহিস্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ। একই সাথে ৫ সদস্যসের প্রোক্টরিয়ার বডির পদত্যাগের ঘঠনাও ঘঠেছে। এবং সকল ধরনের রাজনীতি সভা সমাবেশ মিটিং মিছিল নিষিদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাসে মিছিল করতে দেখা যায়।
গত ২৭ তারিখ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘঠনার পরিপেক্ষিতে ২৯ জানু্য়ারী রাত ৯ টার মধ্যে সকল শিক্ষার্থীকে আবাসিক হল ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেন বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ। ছাত্ররা হল ছেড়ে চলে যাওয়ার আগ মূহূত্বে রাত ৯ টার দিকে মিনিটের সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ (প্রস্তাবিত) কমিটির কয়েক জন নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ছবি ভাংচুর এর অভিযোগ তুলে।
উক্ত ঘঠনার পরিপেক্ষিতে চট্রগ্রাম দক্ষিণ জেলা অাওয়ামী যুবলীগ এর সহ -আইন বিষয়ক সম্পাদক
মোঃ কামাল উদ্দিন বাদী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এর ইতিহাসের প্রথম বারের মত ৬ জন শিক্ষক এর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ৬০/৭০ জনকে আসামি করে সীতাকুন্ড মডেল থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে ঘঠনার সময় সকাল ১০ ঘঠনাটি সংঘঠিত হয় বলে উল্লেখ করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা অাসামী সাবেক প্রোক্টর ড. কাউছার আহমদ শারীরিক অসুস্থ থাকায় ঐ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। একই মামলার আসামি সহকারী প্রোক্টর মোঃনিজাম উদ্দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুউপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কারণে বিকালে প্রবেশ করেন।
এই ঘঠনার পরিপেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ প্রফেসর ড.মোঃ নাজমুল হক নাদভী কে তদন্ত কমিঠির কনভেনার ও মোঃ ইকবাল হোসেন কে সদস্য সচিব করে সাত সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি ঘঠন করেন। উক্ত কমিটি কে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিলেও দু বার পিছিয়ে ৯ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন ঐ তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদন এ কমিটি তাদের ৯টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে কোন শিক্ষার্থীর জাতির জনক ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছবি প্রদর্শনের সুযোগ নেই। এই লক্ষ্যে তদন্ত কমিটি উক্ত ন্যাক্কারজনক ঘঠনার বিষয়ে যথাযত আইনী পদক্ষেপ গ্রহন পূর্বক উক্ত কক্ষের সাথে সম্পৃক্ত সকলের ফরেনসিক পরীক্ষাসহ অন্যান্য অাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী সনাক্তকরণ ও তাদের দৃষ্টানতমূলক শাস্তির সুপারিশ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্টার কর্ণেল মোহাম্মাদ আবুল কাশেম পিএসসি জানান, ২৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি অনেক। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত ২৫ বছরে প্রায় ৩০ হাজার গ্রেজুয়েট বের হয়ে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্টানে কাজ করছে। তারা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্বল করছে। সারা বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এর তালিকার আমরা ৯ম স্থানে আছি একই সাথে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ২৩ তম স্থানে অবস্থান করছি। পুরো চট্রগ্রামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছি আমরা।
বিশ্ববিদ্যালয়টি চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারী ২৫ বছর যাত্রা পূর্ন করে। কিন্তু এই ২৫ বছর পূর্তীর দিনটি ছিল বন্ধ। ছিলো না কোন উৎসব, কোন কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চেয়েছিলো ২৫ বছর পূর্তী মনে মনে চেয়েছিলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বর্ণিল সাঁজে সাঁজবে। মেলে ধরবে তার ভরা যৌবন, নবীন-প্রবিনদের বসবে মিলোনমেলা কিন্ত অনাক্ষাকিত ঘঠনার মধ্যে দিয়ে দিন পার করছে বিশ্ববিদ্যালয়।
সকলের আশা অতিদ্রুত অচলঅবাস্থা দূর হয়ে ফিরে আসুক তার স্বাভাবিকরুপে। মেলে ধরুক বিশ্ববিদ্যালয় তার ভরা যৌবন।