মুহাম্মদ দিদার হোসাইন,
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলাধীন গণ্ডামারা ১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রিপিয়ারিং (মেরামত) কাজের জন্যে আশা বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ সহ বিভিন্ন দূর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার সকালে সরেজমিনে তদন্ত কালে,গণ্ডামারা ৩ নং ওয়ার্ডের হাদির পাড়া ১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, স্কুলের রিপিয়ারিং কাজের জন্যে বিগত ২০১৯ সনের জুন/জুলাই মাসের দিকে বিভিন্ন স্কুলের মেরামত কাজের জন্যে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের পক্ষ থেকে বরাদ্দ আসে,সেই অনুযায়ী আমাদের স্কুলটিতেও ১৩ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে,তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের স্কুলের মেরামত ওই বরাদ্দকৃত মেরামত কাজের দায়িত্ব প্রাপ্ত ঠিকাদার ওই বরাদ্দ থেকে শুধু মাত্র কয়েকটি জানালার কাজ,ছাদের উপরিভাগে এক-দেড় ইঞ্চির মতো বালি ও সিমেন্টেযুক্ত ঢালাই, বারান্দায় একটি ছোট বেচিং ও স্কুল ভবনে- রং মালিশ এবং বিশটি বৈদ্যুতিক ফ্যান ও একশ পিস এনার্জি বাল্ব দিয়ে কাজের সমাপ্তি করে দায়িত্বরত কন্ট্রাক্ট্যার ও শ্রমিকরা অনেক আগেই চলে গেছে,যাওয়ার সময় কন্ট্রাক্ট্যার তাদের বিলের কাগজে আমি সব কাজ বুঝে পেয়েছি মর্মে স্বীকার করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেছিল কিন্তু আমি বরাদ্দ অনুযায়ী স্কুলের মেরামত কাজ বুঝে না পাওয়ায় তাদের বিলের কাগজে স্বাক্ষর করেননি বলে জানান শিক্ষক আরিফুল।অল্প কিছু কাজ করে দীর্ঘদিন পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার ফলে এই নিয়ে এলাকায় দোকানপাট গুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে নানান গুঞ্জন ও সামালোচনা।শনিবার সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়,বর্তমানে স্কুলের বেশ কয়েকটি জানালা অকেজো হয়ে ঝড়াঝির্ণ অবস্থায় থাকা এবং স্কুলের টয়লেট গুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকার দৃশ্য দেখা গেছে,তাছাড়া ভবনটিতে রং এর কাজ করার কিছু দিন না যেতেই অধিকাংশ রং উঠে গেছে শুধু তা নয় বরং স্কুল ভবনটির বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ভবনের নিচে মাটি নীচের দিকে দেবে যাওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়।এতো বড় বরাদ্দের টাকা থেকে সামান্য কিছু কাজ করে স্কুল ভবনটি জড়াঝির্ণ অবস্থায় ফেলে রেখে ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে চলে যাওয়ার ফলে হতভম্ব হয়ে পড়েছে স্থানীয় সচেতন সমাজ। ভবনে ফাটল সৃষ্টির ফলে যে কোন সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দূর্ঘটনা।ওই বরাদ্দের টাকা থেকে যেই বিশটি ফ্যান ও এনার্জি বাল্ব দেওয়া হয়েছে ওইসব ফ্যান ও বাল্ব গুলো নাকি লকডাউনের সময় স্কুল বন্ধ থাকাকালে মেরামত বিহীন ভাঙ্গা জানালা দিয়ে প্রবেশে দূর্ভিত্বরা সব চুরি করে নিয়ে গেছে বলেও জানান শিক্ষক আরিফুল।
এছাড়া প্রতি বছর স্কুলের জন্যে পাক প্রাথমিক শিক্ষা বাবত দশ হাজার টাকা এবং স্লিপ বাবত বাৎসরিক পঞ্চাশ হাজার টাকা,সর্বমোট বাৎসরিক ৬০ হাজার টাকা স্কুলের জন্যে সরকারী ভাবে আসলেও ওই টাকা কোথায় যায়,বা কোন খাতে ব্যয় হয় তাও কোন হিসেব নেই, শুধু তা নয় বরং জাতীয় দিবস গুলোতে খরচের জন্যে যেই সব টাকা আসে তাও কার পকেটে যায় এই নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওই এলাকার শিক্ষিত সমাজের।
স্থানীয় ও স্কুলে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবক সুত্রে জানা যায়, লকডাউনের সময় স্কুল দীর্ঘ বন্ধ থাকার কারণে ছেলে – মেয়েদের পড়া- লেখার ক্ষতি হচ্ছে শুধু তা নয়। লকডাউনের প্রায় কয়েক বছর আগে থেকেই স্কুলে দায়িত্বে থাকা শিক্ষাকরা একদিনও ঠিক সময়ে পড়া-লেখা করাতে দেখেননি বলেও জানান তাঁরা।
এব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা অফিসার (বাঁশখালী)আবু সুফিয়ান এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি চট্টগ্রাম ট্রিবিউন প্রতিনিধিকে বলেন, বিগত ২০১৯ সালে গণ্ডামারা ১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত কাজের জন্যে একটা বড় বরাদ্দ হয়েছিল,ওই বরাদ্দের ব্যাপারে আমাদের কাছে সঠিক কোন তথ্য পাবেন না, যেহেতু বরাদ্দটি ছিল ওয়াল্ড ব্যাংকের আওতায়।
এটা উপজেলা প্রকৌশলী’র কাছ থেকে তথ্য নিতে পারবেন বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে স্কুলের সামনে একটি গেইট নির্মাণের জন্যে বরাদ্দ এসেছে, ইতিমধ্যে গেইটের কাজ শুরু করেছি,তবে ১৩ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা মেরামতের জন্যে বরাদ্দকৃত টাকা থেকে কি পরিমান টাকার কাজ করা হয়েছে? কি কি কাজ করা হয়েছে এবং মেরামতযোগ্য কাজ গুলো সব মেরামত সম্পন্ন করা হয়েছে কিনা?তা জানতে চাইলে তিনি বলেন,এটা মূলত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আওতায় ছিল,তাই আমিও সঠিক বলতে পারছিনা বলে জানান আবু সুফিয়ান।
এব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী(এলজিইডি) বাঁশখালী আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রতিবেদককে বলেন,এই বিষয়ে আপনি ঠিকাদারের সাথে যোগাযোগ করলে সে বলতে পারবে,কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে কিনা।
এবিষয়ে গত বুধবার ঠিকাদার টিটুর সাথে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে টিটু বলেন,কি কি কাজ বাকি আছে তা ইঞ্জিনিয়ার স্যার বলে দিলে তা কাজ করে দেয়া হবে।তবে বিগত ২০১৯ সালের বরাদ্দের কাজটি অল্প কিছু রিপিয়ারিং কাজ করে কাজ বন্ধ রাখার কারণ কি জানতে চাইলে ঠিকাদার কিছু না বলেই মোবাইল ফোন কেটে দেন।ঠিকাদার টিটু বাকী কাজ করে দেয়ার কথা বললেও অদ্য ৭ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার পর্যন্ত কাজে আসেনি।
স্থানীয়রা বলেন, স্কুলটি রিপিয়ারিং কাজের জন্যে একটা বড় বরাদ্দ হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি, কিন্তু ঠিকাদার সামান্য কিছু কাজ করে কাজ বন্ধ করে দিয়ে কেন চলে গেছে তা জানিনা।এসময় স্থানীয়রা রিপিয়ারিং এর সব কাজ পূনরায় সম্পন্ন করার দাবীও জানান।
এব্যাপারে ওই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আরিফুল ইসলাম বলেন, কাজ অসম্পূর্ণ থাকার পরেও তারা কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে আমার কাছ থেকে কাজ বুঝে পেয়েছি বলে কাগজে স্বাক্ষর নিতে চেয়েছিলো,কিন্তু আমি স্বাক্ষর করিনি।তাছাড়া স্কুলের জন্যে আশা বাৎসরিক স্লিপের টাকা এবং প্রাক প্রাথমিক এর বরাদ্দের টাকা গুলো স্কুলের কোন কাজে ব্যবহার করা হয় তা জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আরিফুল বলেন,এটা আমি বলতে পারবো না।
কে বলতে পারবে? তা জানতে চাইলে আরিফুল বলেন, এবিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার স্যার বলতে পারবেন কারণ স্কুলের সব হিসেব বর্তমানে স্যারের কাছে।এসময় আরিফুল আরো বলেন, মহামারী করোনা’র লকডাউনের সময় স্কুল বন্ধ থাকাকালে স্কুল থেকে ২০ টি বৈদ্যুতিক ফ্যান ও ১শ’টি বাল্ব,টয়লেটের জানালা ভেঙ্গে চুরি করে কে বা কারা নিয়ে গেছে।
তবে এই ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবু সুফিয়ান এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, রিপিয়ারিং কাজের বরাদ্দটা মূলত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আওতায় সুতরাং এব্যাপারে আমার কাছে কোন তথ্য নেই। জানালা ভেঙ্গে ফ্যান ও বাল্ব চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,১০-১১ টি ফ্যান চুরি হয়ে গেছে।
এব্যাপারে একটি জিডিও করা হয়েছে বলেও জানা তিনি।তাছাড়া স্কুলের বাৎসরিক স্লিপের টাকা এবং পাক প্রাথমিক এর টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,এটাতো প্রধান শিক্ষক এর কাছে হিসাব থাকার কথা,কিন্তু কেন সে আমার কথা বলল তা জানিনা বলেও জানান তিনি।
স্কুল থেকে বৈদ্যুতিক ফ্যান ও বাল্ব চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়ে শিক্ষক আরিফুল বলেন,বিশটি ফ্যান ও একশটি বাল্ব চুরি হয়ে গেছে, অপরদিকে শিক্ষা অফিসার বলেন, ১০ থেকে ১১ টি ফ্যান চুরি হয়ে গেছে। দুজনের দেয়া বক্তব্যে পরষ্পরের সাথে মিল না থাকায় বিব্রত হয়ে পড়েছে স্থানীয় সচেতন সমাজ।
শুধু তা নয়, জনমনে এখন প্রশ্ন হচ্ছে,কার কথা সত্য? কি শিক্ষা অফিসারের নাকি শিক্ষক আরিফুলের? শিক্ষা অফিসারের দেয়া বক্তব্যোনুযায়ী ১০-১১ টি ফ্যান চুরি হয়ে থাকে তাহলে বাকী ফ্যান গুলো কোথায়?তা জানতে চায় স্থানীয় সচেতন সমাজ। এছাড়া চুরি মালের বিষয়ে করা অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানালেও তদন্তকালে অভিযোগের কোন অফিস কপি স্কুলে দেখাতে পারেননি শিক্ষক আরিফুল।
ঠিকাদার ভবনটির মেরামত কাজ সম্পন্ন না করেই আত্মসাতের মহৎ পরিকল্পনায় কাজ বন্ধ চলে যাওয়ার ফলে দূর্ভিত্যরা চুরি করার সুযোগ নিয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ঠিকাদারের এই দূর্নীতি ও অনিয়মের অন্ত কোথায়?



