Home সর্বশেষ সংবাদ এক্সক্লুসিভ অ্যামাজনের আগুনকে কেন ‘গণহত্যা’ বলছে আদিবাসীরা?

অ্যামাজনের আগুনকে কেন ‘গণহত্যা’ বলছে আদিবাসীরা?

অ্যামাজনের আগুনকে কেন ‘গণহত্যা’ বলছে আদিবাসীরা?

অ্যামাজনের আগুনকে কেন ‘গণহত্যা’ বলছে আদিবাসীরা?

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
লক্ষ-কোটি প্রাণের আধার অ্যামাজনের বেসরকারিকরণের মধ্য দিয়ে একে কৃষি ও খনি সেক্টরের কাছে হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছিলেন ক্ষমতাসীন উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো। ক্ষমতায় আসীন হয়ে তিনি হাঁটছেন সেই পথেই।

এরইমধ্যে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ ভয়াবহভাবে জ্বলছে মানুষ-সৃষ্ট কারণেই। পরিবেশবাদীদের মতে, এই আগুন নেভাতে সরকারের কোনও উৎসাহ নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী দখলদার বনখেকো মানুষ আর খনি ব্যবসায়ীদের আধিপত্যই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে অ্যামাজনের ভবিষ্যতকে। আর গবেষকরা সেখানকার সাম্প্রতিক আগুনের মধ্যে আদিবাসীদের অস্তিত্বের হুমকির নিশানা খুঁজে পেয়েছেন।

আগুনে পুড়ে যাওয়া বনের বৃক্ষরাজি আর হুমকিতে পড়া লক্ষকোটি প্রাণ রক্ষার জন্য প্রাণপন লড়ছেন বন-সংলগ্ন ওইসব মানুষ। এক খোলা চিঠিতে তারা পরিস্থিতিকে মানবিক ও পরিবেশগত দুর্যোগ আখ্যা দিয়েছে। তাদের বোঝাপড়ায়, বৃক্ষসহ সমস্ত প্রাণীই মানুষের মতোন। সে কারণেই অ্যামাজনের আগুনে লক্ষ-কোটি প্রাণ ঝরে পড়ার ঘটনায় গণহত্যার আলামত খুঁজে পেয়েছে তারা।

অ্যামাজনের আদিবাসী মানুষের বাড়ি-ঘর ধ্বংস নতুন কিছু নয়। ১৬ শতাব্দীতে পর্তুগীজরা তাদের জমি লুট করার পর থেকে এই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে তাদের। বলসোনারোর অধীনে তাদের ভাগ্য আরও বিপন্নতায় পর্যবসিত হয়েছে। ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বলসোনারোর কর্মকাণ্ডে শুরু থেকেই স্পষ্ট হয়েছে যে, তারা কাছে আদিবাসীদের অস্তিত্বের প্রশ্ন প্রাধান্যের তলায় অবস্থান করছে। জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার কয়েক দিন পর থেকে বলসোনারো ব্রাজিলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য আদিবাসী বিষয়ক ব্যুরো-এফইউএনএআই বাতিলসহ আনুষ্ঠানিক ফেডারেল সুরক্ষা ভেঙ্গে ফেলতে শুরু করেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্টের কথা ও কর্মকাণ্ডের পরিণতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।

অবৈধভাবে বন উজাড় করার ঘটনা তদন্ত করতে এপ্রিলে ব্রাজিলের অ্যামাজনের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর ভূখণ্ডে সফর করছিলেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পরিবেশ ও সংকটের প্রধান রিচার্ড পিয়ারহাউস। সে সময় তিনি জানতে পারেন, ভূমিদখলকারীরা মানুষকে প্রত্যক্ষভাবে হুমকি দিচ্ছে এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। অনিদ্রা রোগে আক্রান্ত ২২বছর বয়সী একজন মায়ের কথা বলেছেন তিনি, নিকটবর্তী এলাকায় গোলাগুলির শব্দ সত্ত্বেও যিনি সন্তানদের ঘুম পাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অ্যামাজন অঞ্চলের আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্বকারী বেশ কয়েকটি গ্রুপ বৃহস্পতিবার এক খোলা চিঠিতে পরিবেশগত ও মানবিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এই ভয়ানক আগুনকে তাদের ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ উল্লেখ করে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক মানবাধিকার দূত ও মানবাধিকার কমিশনারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানিয়েছে তারা।

গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এ বছর জানুয়ারি থেকে অ্যামাজনে আগুনের পরিমাণ ৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই রেইসফরেস্টের পরিবেশগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞান বিষয়ক পরিচালক অ্যানে অ্যালেরসার স্যাটেলাইটের চিত্র বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিবেশ বিষয়ক ওয়েবসাইট আর্থারকে বলেছেন, ‘এটা ভীতিকর বটে কারণ, আমরা কেবল মৌসুমের শুরুতে আছি।’ পিয়ারহাউস আর্থারকে বলেন, ‘আমরা আদিবাসী ভূমি হিসেবে স্বীকৃত যে ভূমি নথিভূক্ত করতে সক্ষম হয়েছি, সেখানে বন উড়াজকরণ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে, তারা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে এবং আদিবাসী ভূমির বন কাটছে।’তবে আর্থারকে কেউ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি যে, এই আগুন আদিবাসী ভূমি ও গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে কিনা। কয়েক সপ্তাহ ধরে যে আগুন জ্বলছে এতে কোনও সন্দেহ নেই। গবাদি পশুর রাখালরা চারণভূমির জন্য অবৈধভাবে ভূমি পরিষ্কার করছে, ঘঠনাচক্রে সয়াবিন কৃষকদের কাছে জমিও বিক্রি করছে; এর প্রভাব পড়ছে গিয়ে আদিবাসী মানুষের ওপর, যারা রেইনফরেস্টের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

এই বছরের শুরুতে এক তদন্ত শেষে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, পারা রাজ্যের আরারা ও রোনদোনিয়া রাজ্যের উরু-ইউ-ওয়াও-ওয়াও ও কারিপুনা এই তিন ভূখণ্ডের ২৩ আদিবাসীর একটি গ্রুপ তাদেরকে জানিয়েছে, তাদেরকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তারা জানিয়েছিল, বিগত বছরের তুলনায় এবার গ্রামের খুব কাছে ভূমি দখলকারীরা গাছ কাটছে। এই অবৈধ কার্যক্রম রাতে সম্পাদন করে তারা। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, আদিবাসী জমিতে গত কয়েক বছরে আসা ২৪ জন মানুষ এখন শত শত মানুষে পরিণত হয়েছে। পিয়ারহাইস বলছেন, ‘জ্বলন্ত মৌসুমে আমরা যা দেখছি, তা এর তীব্রতা।’ ব্রাজিলের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কারিপুনা ভূখণ্ড সফর শেষে নাসার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সংস্থা জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় এই বছর জানুয়ারি থেকে এই পর্যন্ত চারগুণ বেশি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত ২৫টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এই বছর ইতোমধ্যেই সেখানে আগুন লেগেছে ১০১টি।

১৬ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাস জিংজু পার্ক ও কায়াপো রাজ্যের আদিবাসী ভূখণ্ডের সাম্প্রতিক আগুনকে ‘রিং অব ফায়ার/ আগুনের কুণ্ডলী’ আখ্যা দিয়েছেন ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিদ্যার অধ্যাপক জ্যনেট চারনেলা। আর্থারকে তিনি বলেন, বাসিন রাজ্যে আদিবাসী কৃষকরা যেভাবে আগুন জ্বালায় তার সঙ্গে এই আগুনের মিল নেই। বরং আদিবাসীদের কারণে এই অগ্নিসংযোগকারীরা অঞ্চলগুলি এড়িয়ে চলে। আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা চারনেলা আর্থারকে বলেন, চারনেলা বলেন, ‘আদিবাসীদের অনেক ভূমি হুমকির মুখে। বড় আগুন দ্বারা বাতাস দূষিত হচ্ছে। আদিবাসীদের ক্রিয়াতৎপরতার জন্য অবশ্যই রেইনফরেস্ট থাকতে হবে। মাছের জন্য নদী থাকতে হবে। এই ছোট ফ্লটগুলোতে খাদ্যজম্মাতে তাদের অবশই বনভূমি রাখতে হবে।’

আর্থারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বননির্ভর মানুষগুলোর জন্য অ্যামাজনের সাম্প্রতিক আগুন অস্তিত্বের হুমকি সদৃশ। এই সম্প্রদায়গুলোর যাওয়ার মতো সুপারমার্কেট ও ফার্মেসি নাই। তাদের আছে অ্যামাজন। এই বন তাদের সব ধরনের সেবা দেয়। এখানে তারা শিকার করে, মাছ ধরে ও ঘর নির্মাণের জন্য উপাদানগুলো সংগ্রহ করে। এইসব কারণেই আদিবাসী মানুষেরা বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে বাস করে। তারা বনের ওপর আগ্রাসন চালায় না, কেননা তারা জানে, এতে বন তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বনে যখন আগুন লাগছে, সেই আগুন লাগছে আদিবাসীদের কপালেও। বনের যে অংশে কৃষকরা চাষ করতেন, শিকার করতেন- তা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বাস্তুপ্রক্রিয়ার মানে হলো পারস্পরিকতা।সে কারণে বনের যে অংশে আগুন লাগেনি সেখানেও আগুনের প্রভাব পড়েছে। অনেক ভূমি শুষ্ক হচ্ছে, এলাকাজুড়ে খরা পরিস্থিতি আরও শোচনীয় পর্যায়ে যাচ্ছে।

গবেষণার জন্য অ্যামাজনের আদিবাসীদের সঙ্গে কাজ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামের সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী লেসলি ডে সৌজা আর্থারকে বলেন, ‘বাস্তুতন্ত্রের কার্যক্রম পরিবর্তন করে, যে কোন সময় আপনি একটি অঞ্চলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারেন, যেভাবে সমস্ত জীববৈচিত্র্য সেই বাস্তুতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল। আপনি যখন ওই পরিবেশে বাস করছেন, আপনি সম্পূর্ণরূপে এই উপাদানগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আপনিও এই নিয়মের অংশ।’

অগ্নিকাণ্ডের পর অ্যামাজনের মধ্য দিয়ে হেঁটেছেন ডে সৌজা। তিনি সাপ, গিরগিটি, করালসহ আর ছোট প্রাণীর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন, যারা আগুনে পালিয়ে যেতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘মারত্মক ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেছিলাম। যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। আপনি জমি, বন ও ধ্বংসগুলো দেখছেন, তারপরে সেখানে থাকা সব জিনিস এবং সেগুলোর ওপরনির্ভরশীল যা কিছু।’এই ধ্বংসের প্রভাব আদিবাসীদের বেঁচে থাকার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। লন্ডন ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানী রাফায়েলা ফ্রায়ের মোরেইলা আর্থারকে বলেন, ‘অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী গাছ ও প্রাণীকে মানুষের থেকে আলাদা করে দেখে না। ওইটা তাদের সাংস্কৃতিক বোধ।’তারা মানবাধিকার ও পরিবেশগত অধিকারের মধ্যে পার্থক্য করে না। তিনি এক ইমেইলে আর্থারকে বলেন, ‘আজকে আমরা যে বনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি; অনেক সম্প্রদায় এটাকে কেবল বাস্তু হত্যা হিসেবে নয়, গণহত্যা হিসেবে অনুধাবন করছে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here