Home সর্বশেষ সংবাদ এক্সক্লুসিভ কক্সবাজারে সরকারি ঘর নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি

কক্সবাজারে সরকারি ঘর নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি

কক্সবাজারে সরকারি ঘর নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি

এম এ সাত্তার, কক্সবাজারঃ
‘জমি আছে ঘর নেই যার, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ ’ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে চরম অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রতি ঘর ১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণের কথা থাকলেও তা ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকায় সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রকল্প থেকে লুটপাটের জন্য ঘর নির্মাণে প্ল্যান, ডিজাইন, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুণগত মান বজায় রাখা হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছে নিম্ন মানের নির্মাণসামগ্রী।

কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পের অধীন ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ’ প্রকল্প নিয়ে এমনই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ভুরিভুরি। সরকারি এ প্রকল্পে বিনামূল্যে ঘর দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে বরাদ্দ নিয়ে উঠেছে নানা অভিযোগ। প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ প্রাপ্তদের অনেকেই নিন্মমানের গৃহনির্মাণ সামগ্রী দেয়ার অভিযোগ তোলেন। সেই সাথে বরাদ্দ প্রাপ্ত ঘর তৈরি ও মালামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন স্থানে অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ সরকারি ঘর নির্মাণে উঠা বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে ঠিকাদারের হয়ে ফিল্ডে থাকা রবিউল আলম নামে এক ব্যক্তি জানান, সরকারি নিয়মের ব্যতিক্রম আমরা কোন কাজ করছিনা। টেকসই কাঠ, মালামাল আনা-নেয়ার ভাড়া সরকার না দিলে আমরা কোত্থেকে দেবো। এই অভিযোগগুলো আপনি আপনার থানার ইউএনও’ কে জানান। উনাকে জানালে আমাদের জন্য আরো ভালো হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৭৫ বর্গফুটের ঘর নির্মাণে এক নম্বর ইটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে দুই নম্বর ইট। নকশায় ফাউন্ডেশন ঢালাইয়ের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। পিলার ব্যবহার করা হয়েছে ঘরের ভিতরে ১৭ টি। ৩ টি রড দিয়ে বানানো হয়েছে পিলার, আবার অধিকাংশ পিলারে কোন রড দেয়নি। ৪ টির বদলে জানালা দেওয়া হয়েছে দু’টি। ঘরের বেড়া ও চালে শাল, গর্জন, জারুল, কড়াই, তাল, পিতরাজ, দেবদারু বা আকাশমনি কাঠ ব্যবহারের কথা থাকলেও ওখানে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের শিশু কাঠ, তুলা কাঠ। তাও আবার ওই নিম্নমান কাঠের ছোট কচি ডালের চিরাইকৃত সাদা কাঠ। ঘর এবং বারান্দার মেঝেতে সিসি ঢালাই ৩ ইঞ্চি ধরা থাকলেও ১ থেকে দেড় ইঞ্চি ঢালাই দিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। P.L এর গাথুনির উচ্চতা ১’x৯” ইঞ্চি ধরা থাকলেও বাস্তবে করা হচ্ছে ১’x৩”। পুরো ঘরের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ৬ বস্তা সিমেন্ট। ঘরের দরজা ও জানালায় ব্যবহার করা হয়নি কোন প্রকার চৌকাঠ। স্যানিটারি লেট্রিন ৮টি রিং পরিবর্তে ৫ টি ব্যবহার করা হয়েছে। যা মাত্র কয়েক মাসের মাথায় নষ্ট হয়ে যাবে বলে মত প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা। আর এই সব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে।

একটি সূত্র জানায় ঘর নির্মাণের মালামাল আনা-নেয়ার জন্যও উপকারপভোগীদের পরিবহন খরচ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। আবার ঘর নির্মাণ শ্রমিকদের আসা যাওয়ার ভাড়া, খাবার ,পান-সিগারেট সহ দিনের কাজ শেষে বকশিসের নামেও টাকা গুনতে হয়েছে।

সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড তোতকখালী এলাকার এমতাজ আহাম্মদের জমিতে এই প্রকল্পের আওতায় ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে অযোগ্য কাঠের বাতাম, ইটের খোয়া, নিম্ন মানের ইট । ঘর নির্মাণে অনিয়ম করলেও টিনের চালে কাঠের চাট বা বাথামগূলি ভালো কাঠের দিলে কয়েক বছর স্থায়ী হত। এখন যে গাছগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে তা কিছুদিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে ঘরের চাল গাঁর উপর পড়বে। আর নির্মাণের মালামাল আনতেও বিভিন্ন খাতে টাকা খরচ হয়েছে তার।

একই ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড ছনখোলা মালিপাড়া গ্রামের নেজামুল হকের জমিতেও প্রকল্পের আওতায় ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তার ছেলে দিল মোহাম্মদ জানান, পলিথিন কেনা ও পরিবহন খরচের ব্যয় তাদের বহন করতে হয়েছে। এছাড়া ঘর নির্মাণ শ্রমিকদের খাবারসহ তাদের পিছনে আরো আনুষঙ্গিক টাকা ব্যয় করতে হয়েছে তাকে।

ঝিলংজা ও খুরুশকুল ইউনিয়নে নির্মাণকৃত ঘরের উপকারভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায় ওখানেও এরকম ঘর নির্মাণে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভয়াবহ জাল জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ঘর নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ তাদের। সদরের প্রত্যেকটি ইউনিয়নে সরকারি এসব ঘর নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নানা অনিয়ম করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন।

অভিযোগ উঠেছে, নীতিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ‘পিআইসি’ দ্বারা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) এ ঘরগুলো নির্মাণের কথা। কিন্তু প্রকল্পের নকশা ডিজাইনের তোয়াক্কা না করে গৃহহীন মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করার লক্ষ্যে নিজেদের ইচ্ছামতো অতি নিম্ন মানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ঘর তৈরি করা হচ্ছে।

একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সুব্রত দাশ বলেন, এগুলো আগের পিআইও’র কাজ, সে নতুন এসেছেন। এখন যে ঘরগুলো নির্মাণের জন্য অনুমোদন হয়েছে তা এখনো কাজ শুরু হয়নি। আপনি বরং আগের পিআইও সাকিবকে ফোন দিলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।

অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম মাহফুজুর রহমানের সাথে যোগাযোগের উদ্দেশ্য তাঁর মুঠোফোনে ফোন করা হলে, ফোনে রিং হলেও রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা যায়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here