ক্যাম্পে করোনা আক্রান্ত ৫ রোহিঙ্গা, আতঙ্কে ৩৬০ স্থানীয় পরিবার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৫৮:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২০ ১১২ বার পড়া হয়েছে
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া:
কক্সবাজারের উখিয়ায় গত ১৪মে থেকে ১৭মে পর্যন্ত পর পর ৪দিন রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। ১৭মে সনাক্ত হওয়া একজন সহ এ পর্যন্ত মোট ৫জন রোহিঙ্গা শরনার্থী করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সেবা সংস্থা গুলো এসব আক্রান্ত ব্যক্তিদের নজরদারিতে না রেখে তথ্য গোপন করায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরাঘুরি করার কারনে তাদের সংস্পর্শের আসা লোকজনের কারনে কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্প এলাকায় বসবাসকৃত স্থানীয় ৩৬০ টি পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবী করোনা পজেটিভ রোগীদের প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন এবং তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যাওয়া না হলে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দিকে ধাবিত হতে পারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং তৎসংলগ্ন স্থানীয় এলাকা।

শনিবার (১৬ মে) কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজের ল্যাবে স্যাম্পল টেস্টে ১৮৪ জনের মধ্যে ২৪ জনের রিপোর্ট ‘পজেটিভথ পাওয়া গেছে। ‘পজেটিভথ রিপোর্ট পাওয়া ২৪জন করোনা রোগীর মধ্যে কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৬ জন, চকরিয়া উপজেলায় ৮ জন, পেকুয়া উপজেলায় ১ জন, উখিয়া উপজেলায় ৭ জন তৎমধ্যে রোহিঙ্গা শরনার্থী ১জন, বান্দরবানের লামা উপজেলায় ১জন রোগী রয়েছে।

রোববার ১৭মে করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়া রোহিঙ্গা শরনার্থীর নাম-সাথী আকতার, তার বয়স ১৭ বছর। সে কুতুপালং ২নম্বর ক্যাম্পের পশ্চিম পাশের সি-২ ব্লকের বাসিন্দা। তার মাঝির নাম সাজেদ আমিন। সে কুতুপালং আইএমও হাসপাতালের মাধ্যমে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে স্যাম্পল টেস্টে পাঠিয়েছিলো।
কক্সবাজার আরআরআরসি অফিসের স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা এম আর ভূঁইয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরো জানান, করোনা আক্রান্ত রোগীকে ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্প থেকে পৃথক করে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে স্থাপিত আইসোলেশন হাসপাতালে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন ‘রোহিঙ্গাদের মাঝে করোনা ভাইরাস সংক্রমন হওয়ার পর থেকে ক্যাম্পের অভ্যান্তরে বসবাসকৃত স্থানীয় লোকজন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যান্তরে কোন প্রকার স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দুরত্ব কিছু মানা হচ্ছেনা।

পরিকল্পিত উখিয়া চাইয়ের আহবায়ক সাংবাদিক নুর সিকদার বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা সংক্রমন মানে এটি আমাদের জন্য ভয়ের বিষয়। কারণ, ক্যাম্পে অসংখ্য মানুষ কাজ করছেন। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অনেক সংস্থায় মানুষ চাকরি করেন। চাকরির সুবাধে ক্যাম্পের আসা-যাওয়া করেন তারা। ফলে খুব দ্রুতই স্থানীয়দের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোহাম্মদ আয়ুব মাঝি বলেন, প্রথম ‘করোনায় আক্রান্ত রোহিঙ্গা নুরুল আলম ভয়ে প্রথমে বাসা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে শুক্রবার সকালে রোহিঙ্গা নেতাদের সহায়তায় তাকে এবং পুরো পরিবারটিকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এসে নিয়ে গেছে।কিন্তু তার কারনে আরো অনেকে সংক্রমিত হতে পারে!

স্থানীয় ইউপি সদস্য মৌলভী বখতিয়ার আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা কারনে এমনিতে নানান ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ স্থানীয় লোকজন। তার উপর আবার মহামারী করোনা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ক্যাম্পে যাদের শরীরে করোনা পজেটিভ পাওয়া যাচ্ছে তাদের ব্যাপারে স্বাস্থ্য সেবা সংস্থা গুলো যথাযথ দায়িত্ব পালন করছেনা। যেমন করোনার স্যাম্পল নিয়ে রোগীদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, পরে রিপোর্ট পজেটিভ আসলে তাদেরকে খোঁজে বের করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। এই সময়ে সংক্রমিত ব্যক্তি ক্যাম্পের আরো অনেকে সংস্পর্শে লিপ্ত হয়। যার ফলে ক্যাম্পের অভ্যান্তরে অবস্থানরত ৩৬০টি স্থানীয় পরিবার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, করোনা রোগীর তথ্য গোপন না করে আক্রান্ত এবং সংস্পর্শে আসার ব্যক্তিদের আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা দরকার। অন্যথায় ক্যাম্পে এবং ক্যাম্পের বাইরে মহামারী রূপ নিতে পারেনা করোনা ভাইরাস।

এনিয়ে শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, করোনা পজিটিভ ৪ জন রোহিঙ্গাকে মেডিসিন স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) হাসপাতালের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। কুতুপালং লম্বাশিয়া এফ ব্লকের এক হাজার ২৭৫টি ঘর রেড মার্ক করে লাল পতাকা দিয়ে লকডাউন করা হয়েছে। এসব ঘরে সাড়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ রয়েছে। সেখানে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে মসজিদসহ আরও যেসব জায়গায় আক্রান্ত ব্যক্তি চলাচল করেছেন সেগুলো লকডাউন করা হবে।

এদিকে বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রায় এক হাজার ৯০০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার তৈরির কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ শয্যার কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়াও করোনা আক্রান্তদের জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পরিচালিত হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ঠ সুত্র জানিয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ক্যাম্পে করোনা আক্রান্ত ৫ রোহিঙ্গা, আতঙ্কে ৩৬০ স্থানীয় পরিবার

আপডেট সময় : ০৫:৫৮:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২০

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া:
কক্সবাজারের উখিয়ায় গত ১৪মে থেকে ১৭মে পর্যন্ত পর পর ৪দিন রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। ১৭মে সনাক্ত হওয়া একজন সহ এ পর্যন্ত মোট ৫জন রোহিঙ্গা শরনার্থী করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সেবা সংস্থা গুলো এসব আক্রান্ত ব্যক্তিদের নজরদারিতে না রেখে তথ্য গোপন করায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরাঘুরি করার কারনে তাদের সংস্পর্শের আসা লোকজনের কারনে কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্প এলাকায় বসবাসকৃত স্থানীয় ৩৬০ টি পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবী করোনা পজেটিভ রোগীদের প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন এবং তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যাওয়া না হলে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দিকে ধাবিত হতে পারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং তৎসংলগ্ন স্থানীয় এলাকা।

শনিবার (১৬ মে) কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজের ল্যাবে স্যাম্পল টেস্টে ১৮৪ জনের মধ্যে ২৪ জনের রিপোর্ট ‘পজেটিভথ পাওয়া গেছে। ‘পজেটিভথ রিপোর্ট পাওয়া ২৪জন করোনা রোগীর মধ্যে কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৬ জন, চকরিয়া উপজেলায় ৮ জন, পেকুয়া উপজেলায় ১ জন, উখিয়া উপজেলায় ৭ জন তৎমধ্যে রোহিঙ্গা শরনার্থী ১জন, বান্দরবানের লামা উপজেলায় ১জন রোগী রয়েছে।

রোববার ১৭মে করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়া রোহিঙ্গা শরনার্থীর নাম-সাথী আকতার, তার বয়স ১৭ বছর। সে কুতুপালং ২নম্বর ক্যাম্পের পশ্চিম পাশের সি-২ ব্লকের বাসিন্দা। তার মাঝির নাম সাজেদ আমিন। সে কুতুপালং আইএমও হাসপাতালের মাধ্যমে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে স্যাম্পল টেস্টে পাঠিয়েছিলো।
কক্সবাজার আরআরআরসি অফিসের স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা এম আর ভূঁইয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরো জানান, করোনা আক্রান্ত রোগীকে ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্প থেকে পৃথক করে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে স্থাপিত আইসোলেশন হাসপাতালে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন ‘রোহিঙ্গাদের মাঝে করোনা ভাইরাস সংক্রমন হওয়ার পর থেকে ক্যাম্পের অভ্যান্তরে বসবাসকৃত স্থানীয় লোকজন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যান্তরে কোন প্রকার স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দুরত্ব কিছু মানা হচ্ছেনা।

পরিকল্পিত উখিয়া চাইয়ের আহবায়ক সাংবাদিক নুর সিকদার বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা সংক্রমন মানে এটি আমাদের জন্য ভয়ের বিষয়। কারণ, ক্যাম্পে অসংখ্য মানুষ কাজ করছেন। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অনেক সংস্থায় মানুষ চাকরি করেন। চাকরির সুবাধে ক্যাম্পের আসা-যাওয়া করেন তারা। ফলে খুব দ্রুতই স্থানীয়দের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোহাম্মদ আয়ুব মাঝি বলেন, প্রথম ‘করোনায় আক্রান্ত রোহিঙ্গা নুরুল আলম ভয়ে প্রথমে বাসা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে শুক্রবার সকালে রোহিঙ্গা নেতাদের সহায়তায় তাকে এবং পুরো পরিবারটিকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এসে নিয়ে গেছে।কিন্তু তার কারনে আরো অনেকে সংক্রমিত হতে পারে!

স্থানীয় ইউপি সদস্য মৌলভী বখতিয়ার আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা কারনে এমনিতে নানান ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ স্থানীয় লোকজন। তার উপর আবার মহামারী করোনা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ক্যাম্পে যাদের শরীরে করোনা পজেটিভ পাওয়া যাচ্ছে তাদের ব্যাপারে স্বাস্থ্য সেবা সংস্থা গুলো যথাযথ দায়িত্ব পালন করছেনা। যেমন করোনার স্যাম্পল নিয়ে রোগীদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, পরে রিপোর্ট পজেটিভ আসলে তাদেরকে খোঁজে বের করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। এই সময়ে সংক্রমিত ব্যক্তি ক্যাম্পের আরো অনেকে সংস্পর্শে লিপ্ত হয়। যার ফলে ক্যাম্পের অভ্যান্তরে অবস্থানরত ৩৬০টি স্থানীয় পরিবার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, করোনা রোগীর তথ্য গোপন না করে আক্রান্ত এবং সংস্পর্শে আসার ব্যক্তিদের আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা দরকার। অন্যথায় ক্যাম্পে এবং ক্যাম্পের বাইরে মহামারী রূপ নিতে পারেনা করোনা ভাইরাস।

এনিয়ে শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, করোনা পজিটিভ ৪ জন রোহিঙ্গাকে মেডিসিন স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) হাসপাতালের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। কুতুপালং লম্বাশিয়া এফ ব্লকের এক হাজার ২৭৫টি ঘর রেড মার্ক করে লাল পতাকা দিয়ে লকডাউন করা হয়েছে। এসব ঘরে সাড়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ রয়েছে। সেখানে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে মসজিদসহ আরও যেসব জায়গায় আক্রান্ত ব্যক্তি চলাচল করেছেন সেগুলো লকডাউন করা হবে।

এদিকে বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রায় এক হাজার ৯০০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার তৈরির কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ শয্যার কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়াও করোনা আক্রান্তদের জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পরিচালিত হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ঠ সুত্র জানিয়েছে।