এম এ সাত্তার, কক্সবাজার:
প্রতি বছরের মত এবারও কক্সবাজার জেলার ৮ উপজেলার লাইব্রেরীগুলোতে মূল (বোর্ড বই) বইয়ের সহায়ক বই নাম দিয়ে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকেলাইব্রেরীতে মুল বইয়ের সহায়ক বই হিসেবে বিক্রি হচ্ছে সরকার নিষিদ্ধ নোট গাইড বই
অষ্টম শ্রেনীর নিষিদ্ধ নোট-গাইড বই। তবে কৌশল অবলম্বন করে পাল্টে ফেলা হয়েছে নাম ও মলাট। নোট বই বিক্রি হচ্ছে সহায়িকা অথবা একের মধ্যে এক, দুই,পাঁচ থেকে সব, এ ধরণের বাহারি নামে। ফলে একদিকে মেধাশুন্য হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা, অন্যদিকে নিষিদ্ধ বাহানায় ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের নিকট বেশী দামে এসব গাইড বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন অসাধু লাইব্রেরীর মালিকগন। একই ভাবে চলছে ইংরেজি গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরনের ব্যবসা।
জানা গেছে, চলতি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে জানুয়ারি মাসের শুরু থেকেই বইয়ের দোকানগুলো অবৈধ নোট গাইডে সয়লাব হয়ে গেছে। কক্সবাজারে এলাকা ভিত্তিক বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বইয়ের দোকানগুলোতে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় প্রকাশ্যে বেচাকেনা চলছে নিষিদ্ধ এসব নোট ও গাইড ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সরকারি-বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা বই কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নিম্নমানের গ্রামার বইয়ের নাম প্রেসক্রাইব করছেন।স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার উপর প্রকাশনীগুলোর দেয়া টাকার অংক নির্ভর করে বলে জানা গেছে । অর্থাৎ যত বেশি ছাত্রছাত্রী তত বেশি টাকা বা অফার বা উপহার।
সূত্রে জানা যায়, পাঠ্যবই পড়েই যেন শিক্ষার্থীরা শিক্ষা অর্জন করতে পারে এ উদ্দেশে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে নোট গাইড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু কক্সবাজারে প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ের রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন এক শ্রেণীর বই ব্যবসায়ী। শিক্ষকদের সহায়তার কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে তাদের নোট ও গাইড বই কিনতে বাধ্য হচ্ছে। বই ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা থাকায় তারা মূল বইয়ের সহায়ক বই (গাইড বই) বিক্রি করছেন।
এ ব্যাপারে বই বিক্রির সাথে জড়িতদের কাছে জানতে চাইলে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায়।
কক্সবাজার (লালদিঘির পশ্চিমে) বুক ভিলা লাইব্রেরীর ম্যানেজার রুবেলের বলেন, এসব বই বিক্রিতে সরকারি নিষেধ থাকলেও হালকা-পাতলা বিক্রি করছে তারা।
রহমানিয়া লাইব্রেরীর সহকারি ম্যানেজার অভিযোগের বিষয়টি প্রথমে এড়িয়ে যান। পরে মুল বইয়ের সহায়ক বই হিসেবে বিক্রি করছে বলে স্বীকার করেন।
রহমানিয়া লাইব্রেরীর মালিক ও কক্সবাজার পাঠ্য পুস্তক বই বিক্রেতা মালিক সমিতির সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম নোট গাইড বই বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সে নোট গাইড বই বিক্রি করে না, মূল বইয়ের সাথে হুবহু মিল রেখে (নতুন বোতলে পুরনো মদ বিক্রি) সম্ভাব্য প্রশ্ন সম্বলিত কিছু সহায়ক বই বিক্রি করছে। সে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, এরকম কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে তাহলে তারা অপরাধী হবেন। তিনি আগবাড়িয়ে আরো বলেন সরকার যদি এসব বই বিক্রি করতে নিষেধ করে তাহলে তাও বিক্রি করবেনা।
কক্সবাজারে যে সব লাইব্রেরী গুলোর বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের নিত্য অভিযোগ পাওয়া যায় তা হলো:-রামু’র আল হাবিব লাইব্রেরী, শরীফ লাইব্রেরী, সোবাহানিয়া লাইব্রেরী, হক লাইব্রেরী।, উখিয়ার ফ্রেন্স লাইব্রেরী, উখিয়া লাইব্রেরী, কাইয়ুম লাইব্রেরী, কোর্টবাজারের বিজন লাইব্রেরি। মহেশখালীর আসিফ লাইব্রেরী, রহমান লাইব্রেরী, একুশে লাইব্রেরি, একাত্তর লাইব্রেরি, শোভন লাইব্রেরি। কক্সবাজারে বুক ভিলা লাইব্রেরী, বিদ্যাসাগর লাইব্রেরী, রহমানিয়া লাইব্রেরী , অন্বেষা লাইব্রেরী। চকরিয়ার সাহিত্য নিকেতন লাইব্রেরি, সৌদিয়া বইঘর লাইব্রেরী, ইসলামিয়া লাইব্রেরী, নিউ ইসলামিয়া লাইব্রেরী।
কক্সবাজার পৌর এলাকার বাসিন্দা মামুনুল হক রানা। বুধবার বুক ভিলা লাইব্রেরীতে এসেছেন গ্রামার ও গাইড বই কিনতে। কথা হল তার সাথে। তিনি জানালেন তার সন্তান একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। সরকার আমার সন্তানের সব বই বিনামূল্যে দিয়েছে।এর বাইরে স্কুলের স্যারদের কথা অনুযায়ী আমাকে ৩ টি বই কিনতে ১৩ শত টাকা খরচ করতে হয়েছে।
প্রতিবছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে বিক্রি নিষিদ্ধ নোট-গাইড জব্দ করা হয়। আর এবার, অজ্ঞাত কারণে প্রশাসন নীরব আর এই নিরবতাকে সন্দেহের চোখে দেখছে অভিভাবক মহল।
সরেজমিনে বিভিন্ন লাইব্রেরীতে গিয়ে দেখা গেছে, কক্সবাজার লাইব্রেরী মালিকদের অতীতের ন্যায় এবছর গোপনে নোট, গাইড বই বিক্রি করতে হচ্ছে না। বই বিক্রেতারা উপরের কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজ করে আর স্কুলের শিক্ষকদের প্রেসক্রিপশনে (লেখা তালিকা অনুযায়ি) প্রকাশ্যেই এসব নিষিদ্ধ বই চড়া দামে বিক্রি করছেন। লাল দীঘির পশ্চিম পাড়ের বুকভিলা লাইব্রেরী, রক্ষিতা মার্কেটের রহমানিয়া লাইব্রেরী, বিদ্যাসাগর লাইব্রেরীতে গিয়ে দেখা যায়, সহায়ক বইয়ের আদলে গাইড বই কিনতে আসা বিভিন্ন স্কুলের শতশত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড় সামলাতে লাইব্রেরীর মালিকেরা হিমশিম খাচ্ছে। এমনকি রাহমানিয়া লাইব্রেরী ও বুক ভিলা লাইব্রেরিতে আরো দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। এই লাইব্রেরিগুলোতে ক্রেতাদেরভিড় সামলাতে না পেরে ফুটপাতের উপর বইয়ের স্তূপ রেখে বই বিক্রি করার দৃশ্যে।
এ বিষয়ে জনৈক অভিভাবক ছৈয়দ হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, আমার ছেলে ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ে, ক্লাসের ১ম দিনেই বিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে নোট-গাইড বইয়ের তালিকা । আর ওই সব বই কোথায় পাওয়া যাবে সেই লাইব্রেরির নামও ওই তালিকায় লেখা আছে। তালিকায় থাকা ৩টি গাইড বইয়ের দাম প্রায় তের শত টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক জানান, আমরা কি করব, লাইব্রেরী গুলোতে বিভিন্ন প্রকাশনীর নোট ও গাইড বই বিক্রি করা হচ্ছে । আর আমরাও নোট-গাইড বইয়ের তালিকা ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি। এর জন্য দায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।
এছাড়া বেশ কিছু অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন স্কুল গুলোতে শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমন শিখায় না, তারা প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
কক্সবাজারে সরকারি,আধা সরকারিস্কুল, মাদরাসা , কলেজের শিক্ষকদের শতকরা ৮০ ভাগ প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিংয়ের সাথে জড়িত । স্কুলে পড়াশুনা আগের মত হয় না , এর উদাহরণ দিতে গিয়ে তারা গত ৫ বছরের পাবলিক পরীক্ষায় কক্সবাজারে দুটি সরকারি স্কুল ব্যতিত গোটা জেলার অন্যান্য স্কুলের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে বলেন এই প্রতিবেদককে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সালাউদ্দিন চৌধুরীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার তাঁদের নেই। এ বিষয়ে অবহিত পূর্বক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কক্সবাজার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( শিক্ষা) কে জানাতে বলেন।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ আমিন আল পারভেজ বলেছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।
আইন কি বলেঃ- উল্লেখ্য, সরকার ১৯৮০ সালে নোট ও গাইড প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে। পরে ২০০৭ সালে ১০ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পুনরায় জেলা প্রশাসকদের নোট গাইড বই বাজারজাত বন্ধের জন্য নির্দেশ দেন। এরপর বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রয় সমিতি করা রিটে শুনানিতে ২০০৯ সালে নবেম্বর হাইকোর্ট প্রথম শ্রেণী হতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নোট গাইড মুদ্রণ, প্রকাশনা, বিক্রয় ও বাজারজাতকরণ পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তাছাড়া খসড়া শিক্ষা আইনে ২০১৩ তে এসব নোট ও গাইডকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৩(১), ধারায় নোট বই ছাপানো, প্রকাশ, আমদানি, বিক্রি বিতরণকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ আইন লংঘন করলে সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড দেওয়ার বিধান আছে।