স্মারকলিপি
সেপ্টেম্বর ০৫,২০২০
মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার,
বাংলাদেশ সচিবালয় ঢাকা।
বিষয়: বাঁকখালী নদীর উপর পিএমখালীর ছনখোলা-ঝিলংজা এসএমপাড়া অংশে সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে।
মাধ্যম: জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত পর্যটন নগরী ককসবাজারের সর্বস্তরের জনতার পক্ষ থেকে আপনাকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম ও অভিনন্দন। পরপর ৪’বার প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করে সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং দূরদর্শী চিন্তা ও গভীর দেশপ্রেমের মধ্য দিয়ে আপনি দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দিয়েছেন। আপনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সুযোগ্য কন্যা, বাংলার দু:খী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আপনি নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আপনার এই অবদানের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
আপনার সরকারের আমলেই এই কক্সবাজারে আশানুরূপ রেকর্ড পরিমাণ উন্নয়ন হচ্ছে। আপনার অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় বড় বড় রাস্তাঘাটসহ এখন উন্নয়নের মহোৎসব চলছে। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে ছোট্ট আরেকটি আরজি নিয়ে আমরা আজ আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। সেটি হচ্ছে, বাঁকখালী নদীর উপর পিএমখালী ছনখোলা কেয়াঘাট-ঝিলংজা এসএমপাড়া অংশে একটি সেতু নির্মাণ করা।
প্রশ্ন উঠতে পারে বাঁকখালী নদীতে তো এক’টি সেতু আছে, তাহলে আমরা দ্রুত কেন আরেকটি সেতু চাই? এ প্রশ্নের জবাব দিতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে।
বাঁকখালী নদীর উপর পিএমখালী-ঝিলংজা অংশে একটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে পিএমখালী, ভারুয়াখালী, খুরুশকুল (একাংশ)সহ সমগ্র উত্তর দক্ষিণ কক্সবাজারের মানুষ বিশেষভাবে অনুভব করে আসছেন।
বাঁকখালী নদীর উপর মাঝিরঘাট-খুরুশকুল সেতু নামে একটি অস্থায়ী সেতু থাকলেও বিগত কয়েক বছরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে সেটি কার্যত অক্ষম একটি সেতুতে পরিণত হয়ে আছে। ফলশ্রুতিতে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলার বড় গাড়ির চাপ, পাশাপাশি কক্সবাজার-চট্রগ্রামের ভারি যানবাহনের চাপ এসে পড়ে একমুখী মাঝিরঘাট সেতুর উপর। আবার পুরো জেলার ভারী যানবাহনের চাপ সামলাতে গিয়ে বিএনপি জোট আমলে নির্মিত একমুখী মাঝিরঘাট সেতুর নিজের অবস্থায় নড়বড়ে হয়ে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাঁকখালী নদীর উপর মাঝিরঘাটে বর্তমানে যে সেতুটি আছে সেটি কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সেতু নয়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ হতে নৌকাযোগে নদী পারাপারে ভূমিকা রেখে আসছিল ছনখোলা-ঝিলংজা সরকারি ইজারাকৃত খেয়াঘাট।এ হিসেবে দেখা যাচ্ছে ওই ছনখোলা খেয়াঘাটের বর্তমান বয়স প্রায় একশত বছরের অধিক।
কক্সবাজার সদরের একাধিক ইউনিয়নের মানুষ বিকল্প পথ হিসেবে নৌকা-সাম্পানযোগে ঝুঁকি নিয়ে ছনখোলা খেয়াঘাট পারাপার হয় মানুষকে। বছর না যেতেই ওই ঘাটে নৌকা ডুবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। গত তিন-চার বছর আগে একসাথে ৩ জন, গতবছর ১ জন, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ ছনখোলা খেয়াঘাটের নৌকা ডুবে একাধিক মানুষ আহত হয়ে সাতারিয়ে কূলে ফিরে আসলেও ১ জন পানিতে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার ৪ দিন পর মহেশখালী প্যারাবনে লাশ পাওয়া যায়।
বর্ষার মৌসুমে নদীর এপার ওপার ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে দিনদিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে মৃত্যুর ফাঁদ সৃষ্টি হচ্ছে। যে কারণে উক্ত ঘাটে প্রতিবছর একাধিক মানুষের সলিল সমাধি হচ্ছে।স্থানীয়রা জানান ছনখোলা খেয়াঘাটের উভয় পাশে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা জেটি ২টি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে যে, সর্বোচ্চ ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সেটি ধসে পড়ে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।
বর্তমানে উক্ত ঘাটের উপর দিয়ে মানুষের চলাচলের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে। এর ফলে ঘাটের একপাশ দিয়ে নৌকায় উঠলে আরেকপাশে দাঁড়িয়ে থাকে শতশত মানুষ। এমনকি প্রাকৃতিক আবহাওয়া খারাপ থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীর দু’পাশে আটকে পড়ে মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।রাত ৯ টার পরে ঘাটের মাঝি পাওয়া যায় না। সেই সাথে ওই ঘাটের মধ্যে দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রাণহানির ঘটনাও একেবারে কম নয়।
এজন্য ১৯৯০ সালে বাঁকখালী নদীর ছনখোলা খেয়াঘাট এলাকায় আরেকটি সেতু নির্মাণের প্রাথমিক পদক্ষেপের কথা আমরা প্রশাসনকে জানিয়ে আসতেছি। বিগত জোট সরকার আমলে ছনখোলা ঘাটে সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেন। জোট সরকারের পক্ষ থেকে ওই ছনখোলা-ঝিলংজা কেয়াঘাটে প্রতিশ্রুত এ সেতু দ্রুত নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন এমপি। এরপর সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান যাচাই করে স্থান নির্ধারণ করা হয়।
এরপর ব্রিজের টেন্ডার হয়ে গেলে উক্ত ছনখোলা খেয়াঘাটে ব্রিজ তৈরি করার জন্য শ্রমিকদের থাকার ঘরও তৈরি করেছিলেন ঠিকাদার।এসব দৃশ্য দেখার পর বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ খুশির আমেজে মজেছেন। কিন্তু কয়েক দিন পর দেখা গেছে আশার গুড়ে বালি।অত্র এলাকার মানুষের স্বপ্ন ভেংগে তছনছ। এক এক স্থাপনা গুড়িয়ে নিয়ে অপরিকল্পিত স্থান মাঝিরঘাট নামক স্থানে ব্রীজটি তৈরি করা হয়। যার দরুন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষ সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
কিন্তু এরপর থেকে ছনখোলা-ঝিলংজা সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়ায় দৃশ্যত আর কোন অগ্রগতি না দেখে হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন অত্র এলাকার মানুষ। পিএমখালী-ঝিলংজা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ জনপ্রতিনিধি, এমপি, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেতু বাস্তবায়নের দাবি জানায়। দু:খজনক হলেও সত্য, এক্ষত্রে সবার কাছে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস ছাড়া কিছু ই পাওয়া যায়নি। কিন্তু বারবার আশ্বাসের বাণী শুনতে শুনতে বিশ্বাসে এখন চিড় ধরতে শুরু করেছে।
আমরা জানি, আমরা বিশ্বাস করি, গরীব-দু:খী মানুষের মাঝে হাসি ফোটাতে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দেন, সেই প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। আপনি ১৬ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক, গরীব-দু:খী মেহনতি মানুষের নেত্রী, আপনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এ অবস্থায় কক্সবাজারের আপামর মানুষের আপনার দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। জনগণের আবেদন-নিবেদন জানানোর একমাত্র ঠিকানা তো আপনিই।
আপনার কাছেই আমাদের বিনীত আরজি, পিএমখালী- ঝিলংজা সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি। কক্সবাজারের হাজার হাজার মানুষের প্রাণের দাবি নিয়ে আজ আমরা আপনার দরবারে হাজির হয়েছি। আমাদের আর্তি যেন আপনার কাছে পৌঁছে, সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করছি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, পিএমখালী-ঝিলংজা সেতু নির্মাণ হলে কি কি সুফল পাবেন ককসবাজারবাসী ? আমরা বলতে চাই, বাঁকখালী নদীপাড়ের জনপদ পিএমখালী, ভারুয়াখালী, ঈদগাহ উত্তরাঞ্চল এবং এর সঙ্গে আছে পুরো দক্ষিণ বৃহত্তর ঝিলংজা। শহরের মূল পয়েন্ট যদি আমরা নিউমার্কেটকে ধরি তাহলে সেখান থেকে দূরত্ব মাত্র ৫ থেকে ৬ মাইল। একটি সেতুর কারণে এ দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে কখনও এক/দেড় ঘণ্টা, কখনও দুই/আড়াই ঘণ্টা।
বঞ্ছনার এখানেই শেষ নয়। শহরের এত কাছের জনপদ পিএমখালী, খুরুশকুল, ভারুয়াখালী, অথচ এ জনপদ এখনও যেন অজ পাড়াগাঁ। সেতুর একপাশে শহর-নিয়ন বাতির আলো, আরেক পাশে গ্রাম-কুপির আলোয় অন্ধকার দূর করছে মানুষ। অথচ এ জনপদ হতে পারত একটি পরিকল্পিত উপশহর, হতে পারত একটি মডেল টাউন। এ জনপদ হতে পারত একটি পরিকল্পিত শিল্পনগরী। নদী আর পাহাড়ের মিলনস্থলকে ঘিরে হতে পারত দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট।
বাঁকখালী উপর যদি একটি দ্বিমুখী সেতু হয়, তাহলে ককসবাজার শহরের উপর চাপ কমবে। কক্সবাজার শহর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন নামিয় শিল্প কারখানা স্থানান্তর হবে নদীর উত্তর পাড়ে। কক্সবাজার শহরে এখন বলতে গেলে শিল্পকারখানা করার মত কোন জায়গা নেই। এক্ষেত্রে পিএমখালী-ভারুয়াখালী হতে পারে উত্তম স্থান। এছাড়া শহরের উপর মানুষের চাপও কমবে। যাতায়াতের সমস্যার জন্য যারা শহরে এসে ভিড় করেছেন তারা আবারও ফিরে যাবেন গ্রামে।
সবচেয়ে মূল যে বিষয়টি, সেতু হলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে বিপ্লব হবে। ঈদগাহ,ভারুয়খালী, পিএমখালী, ককসবাজার টাউনের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে সহজ হয়ে যাবে। এতে যাবতীয় কাঁচামাল দ্রুত সরাসরি পৌঁছে যাবে বিভিন্ন স্থানে। আমরা চাই, এদেশের পিছিয়ে থাকা বিস্তির্ণ জনপদের উন্নয়ন হোক এটাই আমরা চাই। অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হোক, এটাই আমরা চাই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
আপনি জাতির জনকের রক্তের উত্তরাধিকারী। এদেশের মানুষ আপনার সঙ্গে রক্তঋণে আবদ্ধ। বঙ্গবন্ধু এবং তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের স্মৃতিধন্য এই কক্সবাজারের মানুষ বারবার তাদের অকুণ্ঠ আস্থা-সমর্থন জ্ঞাপন করেছে আপনার উপর। আপনিও কখনও ককসবাজারবাসীকে বিমুখ করেননি। আপনার সরকারের কারণেই উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত হয়েছে ককসবাজার।
আপনার কাছেই আমাদের নিবেদন-ককসবাজারবাসীর ক্ষুদ্র প্রাণের দাবি, বাঁকখালী নদীর উপর পিএমখালী-ঝিলাংজা অংশে একটি দ্বিমুখী সেতু দ্রুত বাস্তবায়নে আপনি ব্যবস্থা নিন। আমাদের বিশ্বাস-আপনার সরকারের পক্ষেই এই দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব। আপনি এই সেতুর দ্বার খুলে দিয়ে ককসবাজারের উন্নয়নে নবদিগন্ত উন্মোচন করবেন,এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
নতুন আশায় বুক বেঁধে অসহায়-বঞ্চিত ককসবাজারবাসী আপনার সুদৃষ্টির অপেক্ষায় আছেন৷
সৃষ্টিকর্তা আপনার সহায় হোন। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
এলাকাবাসীর পক্ষে,
১। সাংবাদিক এম এ সাত্তার,
২। মোহাম্মদ হাশেম,
৩।কেফায়েত উল্লাহ,
৪। মোস্তাক আহমেদ